
সকাল ৯টা ৪১ মিনিট। পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার থেকে ‘ভিক্টর ক্লাসিক’ বাসে ওঠেন অফিসগামী সাইফুল ইসলাম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি ভেবেছিলেন, যাত্রাটা হয়তো কিছুটা স্বস্তির হবে। কিন্তু কিছু দূর যেতেই তার সেই প্রত্যাশা ভেঙে পড়ে। ভাড়া বাড়ার ঘোষণা এলেও সেবার মান যে আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে, তা পুরো যাত্রাপথেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৯টা ৪৮ মিনিটে বাসটি নর্থ সাউথ রোডের সিদ্দিক বাজার অতিক্রম করে। কিছুক্ষণ পর ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড ও গুলিস্তান পেরিয়ে যায় মাত্র ৫ মিনিটে। চলতি পথে যাত্রী তুলতে তুলতে বাসটি এগিয়ে চলে। ১০টা ৫ মিনিটে মগবাজার উড়ালসড়কে ওঠে।
বাসের ভেতরের চিত্র: অস্বস্তি আর অবহেলা
বাসে উঠেই চোখে পড়ে নানামুখী সমস্যা। ফ্যান অচল, সিটের কাভার ময়লা, ভেতরের পরিবেশ অপরিষ্কার। জানালায় কোনো পর্দা নেই, ফলে রোদের কারণে যাত্রীদের বসতে সমস্যা হয়। অনেক সময় সিট খালি থাকলেও রোদে বসতে না চাওয়ায় তা ফাঁকাই পড়ে থাকে।
অতিরিক্ত যাত্রী তোলা যেন নিয়মিত ঘটনা। বাসে ধারণক্ষমতার বাইরে যাত্রী নেওয়ায় গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেককে। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকারিতা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অন্য যাত্রীরা সেই আসন দখল করে রাখেন।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতা: ভাড়া বাড়লেও বাড়েনি স্বস্তি
রামপুরাগামী সেই সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিন এই রুটে চলাচল করি। প্রায়ই ভাড়া বাড়ার ঘোষণা আসে, কিন্তু বাসের ভেতরের অবস্থা আগের মতোই রয়ে যায়। ফ্যান চলে না, গরমে বসে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়। সিটগুলো নোংরা থাকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বালাই নেই। এই অবস্থায় বাড়তি ভাড়া নেওয়াটা যাত্রীদের সঙ্গে অন্যায় মনে হয়।’
শারমিন আক্তার বলেন, নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলেও বাস্তবে সেটা মানা হয় না। অনেক সময় দাঁড়িয়ে যেতে হয় পুরো পথ। কেউ জায়গা ছেড়ে দিতে চায় না। আবার জানালায় পর্দা না থাকায় রোদে বসা যায় না, এতে ভোগান্তি আরও বাড়ে। এসব বিষয়ে কোনো তদারকি ন
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাসেল বলেন, বাসে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা এখন নিয়মে দাঁড়িয়েছে। চালকের সহকারীরা মাঝপথে আরও যাত্রী তোলে, এতে গাদাগাদি করে চলাচল করতে হয়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থাকে। কিন্তু এসব বিষয়ে কারও কোনো নজর নেই।
প্রবীণ যাত্রী আব্দুল করিম বলেন, বয়স্ক মানুষের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। বাসে ওঠা-নামাও কষ্টকর হয়ে যায়। সংরক্ষিত আসন থাকলেও কেউ তা ছাড়তে চায় না। আমরা কষ্ট করে যাতায়াত করি, কিন্তু আমাদের কথা কেউ ভাবে না।
ভাড়া নিয়ে বিভ্রান্তি: তালিকা নেই
নতুন ভাড়া কার্যকরের ঘোষণা থাকলেও বাসের কোথাও কোনো ভাড়ার তালিকা টানানো নেই—না নতুন, না পুরনো। বাসে দেখা যায়, পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত যাত্রীরা এখনো নির্দিষ্ট ১০ টাকাই ভাড়া দিচ্ছেন। অন্য স্থানেও আগের ভাড়াই আদায় করছিলেন বাসচালকের সহকারী।
বাসের পরিবেশ এমন কেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাসে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েই থাকে। কিছু ঠিক করা হয়, আবার কিছু খরচ বেশি হওয়ার কারণে পড়ে থাকে। সিটের কাভার দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, তাই নিয়মিত পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না। জানালার পর্দাও লাগানো হয় না—নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মালিকপক্ষ এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখায় না।
যাত্রী অধিকার: সমস্যার মূল কোথায়
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, যাত্রীদের নানাবিধ সমস্যা সম্পর্কে সবাই জানে, কিন্তু সেগুলোর সমাধান হয় না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বিদ্যমান সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় যাত্রীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নেই। যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো অনেক সময় সরকারের টেবিল পর্যন্ত পৌঁছায় না।
তিনি আরও বলেন, যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের কথা থাকলেও বাস্তবে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটিগুলোতে মালিকপক্ষের প্রভাব বেশি। ফলে যাত্রীদের সমস্যা নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয় না। মালিকরা তাদের সুবিধার বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারে, কিন্তু যাত্রীদের দুর্ভোগ থেকে যায়।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনগত পরিবর্তন জরুরি। পরিবহন সংশ্লিষ্ট সবক্ষেত্রে যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে তাদের সমস্যাগুলো যথাযথভাবে উঠে আসবে এবং সমাধানের পথ তৈরি হবে। অন্যথায় শুধু ভাড়া বাড়বে, কিন্তু সেবার মান আর বাড়বে না।
ভাড়া বৃদ্ধি: সরকারের সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বাসভাড়া সমন্বয়ের ঘোষণা দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা (৪.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি)। দূরপাল্লার বাসে ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ২৩ পয়সা (৫.১৯ শতাংশ বৃদ্ধি)। ডিটিসিএ এলাকায় ভাড়া ২ টাকা ৩২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা (৪.৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি)।
তবে সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ ও ১০ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, এই ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাসের জন্য প্রযোজ্য। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তিনি আরও বলেন, তেলের দাম বাড়া-কমার সঙ্গে সমন্বয় করে ভাড়াও সমন্বয় করা হবে—এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
গত ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ডিজেল প্রতি লিটার ১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও কেরোসিন ১৮ টাকা বৃদ্ধি পায়, যা ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়। এর পরপরই পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানোর দাবি ওঠে এবং বৈঠকের মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হয়।


