
‘হত্যা-ধর্ষণ-ভূমি দখল বন্ধ করতে হবে’
‘অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা চাই’—এমন নানা স্লোগানে রাজশাহীতে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন, জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন এবং সরকারি চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহালসহ ৯ দফা দাবি জানানো হয়েছে।রোববার (৯ আগস্ট) সকালে নগরীর আলুপট্টি মোড় থেকে বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্য দিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়। র্যালিটি নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট এলাকার মুন লাইট গার্ডেন কনভেনশন সেন্টারে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আলোচনা সভায় আদিবাসী নেতারা বলেন, এ ভূখণ্ডের প্রাচীন অধিবাসী হিসেবে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভূমি ও জীবনযাপন বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তাদের ভূমি ও অধিকার নিয়ে নানা সংকট চলছে। তাই সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে প্রতিটি আদিবাসী জাতিসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয় ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি অধিকার আদায়ের অঙ্গীকারের দিন। আদিবাসীদের প্রতিটি জাতিসত্তার মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও চাকরিতে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে সরকারি চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা নিশ্চিত করারও দাবি জানান তারা।
নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময়ে আদিবাসীদের ভূমি দখল এবং আদিবাসী নারীদের ওপর ধর্ষণ, নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। সরকার পরিবর্তনের পরও হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন তারা। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান বক্তারা।
সমতলের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার রক্ষায় পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, ভূমি দখল ও বেদখলের ঘটনায় আদিবাসীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ভূমি অফিসে দুর্নীতি ও ঘুষ বন্ধের পাশাপাশি বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার করতে হবে। ভূমি-সংক্রান্ত হয়রানি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
সভা থেকে সরকারের প্রতি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসন, পৃথক মন্ত্রণালয়, উচ্চশিক্ষায় কোটা ও বৃত্তির ব্যবস্থা এবং সরকারি চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা নিশ্চিত করার দাবি উঠে।
আলোচনা সভায় আদিবাসীদের পক্ষ থেকে ৯ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. সংবিধানে আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
৩. জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ করতে হবে।
৪. সরকারি চাকরিতে আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল ও নিশ্চিত করতে হবে।
৫. উচ্চশিক্ষায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অপহরণ বন্ধ করে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৮. আদিবাসীদের জমি জবরদখল বন্ধ, বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার এবং ভূমি-সংক্রান্ত হয়রানি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৯. ভূমি অফিসের দুর্নীতি-ঘুষ বন্ধ, আদিবাসীদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় বরাদ্দ অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং ছিন্নমূল আদিবাসীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ আলী ইশা, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম খোকা, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি গণেশ মার্ডি, সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়ার, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি ছোটন সরদার এবং আদিবাসী যুব পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি যাদু কুমার দাসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভা শেষে পরিবেশিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।


