
রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া এলাকায় মোহাম্মদ আলী সরকারের মালিকানাধীন একটি হিমাগারে ডেকে নিয়ে এক মেডিকেল শিক্ষার্থী, তার খালাতো বোন এবং এক কিশোরীকে নির্মমভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর মামলা হলেও, অভিযুক্তরা আদালত থেকে জামিন পেয়ে গেছেন। এ নিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—দুর্বল ধারায় মামলা দিয়ে জামিন নিশ্চিত করার পথ করে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে সরকার কোল্ড স্টোরেজে নিয়ে যাওয়া হয় ২৭ বছর বয়সী বিশাল খন্দকার অমি, তার খালাতো বোন আইরিন ইসলাম জুই (৩০) এবং ১৩ বছর বয়সী ইরিন ইসলাম জুবাকে। সেখানে তাদের লাঠি, বাঁশ ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে শরীরে সেফটি পিন ফুটিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন থাকলেও, হাসপাতাল সূত্র জানায়—তারা শঙ্কামুক্ত।

ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কোল্ড স্টোরেজ ঘেরাও করে ভাঙচুর চালায়। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুলিশ অভিযুক্ত আহসান উদ্দিন সরকার জিকো (৪৫), আঁখি (৩৫) ও হাবিবা (৪০)-কে গ্রেপ্তার করে। পরদিন বুধবার রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের হাজির করা হলে বিচারক মো. মনিরুজ্জামান জামিন মঞ্জুর করেন। জামিন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কারণ মামলায় যে ধারাগুলো (৩৪২/৩২৩/৩২৫) ব্যবহার করা হয়েছে, তা সবই জামিনযোগ্য।
মামলার বাদী জনাবুর রহমান বিপুল জানান, পুলিশ শুরুতে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সমঝোতার প্রস্তাব দেয়। পরে তার চাপের মুখে মামলার খসড়া অভিযোগকেই এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করে, যেখানে নির্যাতনের ভয়াবহতা থাকা সত্ত্বেও তীক্ষ্ণ অস্ত্র ব্যবহার সংক্রান্ত ৩২৬ ধারা প্রয়োগ করা হয়নি। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী পারভেজ তৌফিক জাহেদী বলেন, “সেফটি পিন একটি তীক্ষ্ণ বস্তু। এটিকে অস্ত্র হিসেবে ধরা হলে ৩২৬ ধারা প্রযোজ্য হতো, যা অজামিনযোগ্য। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল ধারা ব্যবহার করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও এয়ারপোর্ট থানার ওসি ফারুক হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “দুর্বল ধারা বসানো হয়নি। যেসব ধারা প্রযোজ্য ছিল, সেগুলোই দেওয়া হয়েছে। সেফটি পিনের জন্য আলাদা কোনো ধারা নেই।” অভিযুক্তদের বাবা মোহাম্মদ আলী সরকার রাজশাহীর একজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী। তিনি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবং সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন। তার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই মামলায় দুর্বলতা এসেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, “আহত তিনজন চিকিৎসাধীন থাকলেও, বর্তমানে তারা শঙ্কামুক্ত। তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।” অন্যদিকে, মামলার বাদী জনাবুর রহমান দাবি করেন, মামলা তুলে নিতে মঙ্গলবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তাকে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং পুলিশের একাংশও এতে জড়িত ছিল।
এই বিষয়ে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, “মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এই ঘটনায় একদিকে যেমন প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও মানবাধিকার কর্মীরা।


