
জিআই স্বীকৃতির পর বাড়ছে পরিচিতি, হাজারো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে জড়িত মিষ্টি পান
রাকিবুল ইসলাম, মোহনপুর (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর মোহনপুরে ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে পানের ভালো ফলন হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে পানের দামও বেড়েছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে পানচাষিদের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত মোহনপুরের মিষ্টি পান এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও পরিচিতি পাচ্ছে।
মোহনপুরের মিষ্টি পান’ ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ পানের পরিচিতি ও বাজার চাহিদা আরও বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা মোহনপুরের বিভিন্ন হাট-বাজারে এসে পান সংগ্রহ করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে সরবরাহ করছেন। স্থানীয়দের দাবি, স্বাদ, ঘ্রাণ ও আকারে ভালো হওয়ায় মোহনপুরের মিষ্টি পানের আলাদা কদর রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মোহনপুরে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। এসব জমিতে প্রায় ১৪ হাজার ৭০০টি পান বরজ রয়েছে। উপজেলার বাকশিমইল, মৌগাছি, ধুরইল, ঘাসিগ্রাম, জাহানাবাদ, রায়ঘাটি ইউনিয়ন ও কেশরহাট পৌরসভা এলাকায় ব্যাপকভাবে পান চাষ হচ্ছে। পান চাষকে কেন্দ্র করে কৃষক, শ্রমিক, বাঁশ-খড়সহ বরজ তৈরির উপকরণ সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসায়ী ও পাইকারদের নিয়ে বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছে।
চাষিরা জানান, বরজ তৈরির প্রথম বছরে তুলনামূলক বেশি খরচ হয়। মাটির আইল, বাঁশের বেড়া, ছাউনি, লতা, শ্রমিক ও অন্যান্য উপকরণ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত প্রাথমিক খরচ হতে পারে। পরবর্তী বছরগুলোতে খরচ তুলনামূলক কমে আসে। নিয়মিত পরিচর্যা ও বাজারদর ভালো থাকলে একটি বরজ থেকে বছরে কয়েক লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব।
সইপাড়া গ্রামের পানচাষি রইচ উদ্দিন বলেন, তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে মিষ্টি পান চাষ করছেন। ৫০ কাঠা জমি থেকে তিনি ভালো আয় করেছেন। তার ভাষায়, পান তাদের কাছে ‘সোনার পাতা’। কারণ প্রয়োজনের সময় বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করলেই নগদ অর্থ পাওয়া যায়।

জাহানাবাদ গ্রামের পানচাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে পানের দাম ভালো পাচ্ছেন। তিনি বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে সরাসরি ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠাচ্ছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কম থাকায় তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। তার মতে, বাজারে বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে পানচাষিরা আরও উৎসাহিত হবেন।
চাঁদপুর গ্রামের কৃষক আবদুল হামিদ বলেন, পান চাষ করেই তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে পান চাষে রোগবালাই ও আবহাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টি, বরজে পানি জমে যাওয়া এবং বিভিন্ন রোগের কারণে অনেক সময় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও সহজলভ্য রোগবালাই দমন ব্যবস্থা থাকলে চাষিরা আরও উপকৃত হবেন।
বর্তমানে বাজারে আকার ও মানভেদে পানের দামও ভালো। চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চিকন পান বিড়া প্রতি প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা, মাঝারি পান ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং বড় পান ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ভালো মানের পান আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় হাটগুলোতে প্রতিদিনই পান নিয়ে আসছেন কৃষকেরা। মৌগাছিসহ কয়েকটি বড় হাট থেকে পাইকাররা পান সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাচ্ছেন।
তবে পান চাষে ঝুঁকিও কম নয়। পানগাছ অতিরিক্ত রোদ, জলাবদ্ধতা ও আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্ষা মৌসুমে গোঁড়া পচাসহ বিভিন্ন রোগের আক্রমণ দেখা দেয়। পাশাপাশি বাঁশ, খড়, শ্রমিকের মজুরি, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ভালো বাজারদর না থাকলে চাষিদের লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় উপজেলায় পান চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে বিপুল পরিমাণ জমিতে পান চাষ হচ্ছে। জিআই স্বীকৃতির ফলে মোহনপুরের পানের পরিচিতি আরও বেড়েছে। কৃষকদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং রোগবালাই দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে পান চাষ থেকে কৃষকের আয় আরও বাড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আ. মতিন বলেন, রাজশাহীর মাটি ও আবহাওয়া পান চাষের জন্য বেশ উপযোগী। জেলার মোট পান চাষের বড় একটি অংশ মিষ্টি পান। স্বাদ ও ঘ্রাণের কারণে এ পানের চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানসম্মত পান বিদেশেও যাচ্ছে। কৃষকদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পান চাষ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক পরিচর্যার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পানকে টেকসই কৃষিপণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধান-পাটসহ প্রচলিত অনেক ফসলের তুলনায় পান চাষে কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি। একটি পান বরজকে ঘিরে দীর্ঘ সময় ধরে কৃষক ও শ্রমিকের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে পান শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, মোহনপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
চাষিদের প্রত্যাশা, পান চাষে সহজ শর্তে কৃষিঋণ, রোগবালাই দমনে কার্যকর সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে মোহনপুরের মিষ্টি পান চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে। জিআই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে দেশের বাজারে মোহনপুরের পানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাও বাড়বে।


