

জিন্নাহর ছবি ইতিহাসের কোনো আর্কাইভে থাকবে না—এমন কথা বলার কারণ নেই। তিনি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা এবং উপমহাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন রাজনৈতিক নেতা।
১৯৪৮ সালের মার্চে জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এর অর্থ এই ছিল না যে বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে নিষিদ্ধ করা হবে। কিন্তু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠার তাঁর অবস্থান পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা ভাষিক ও রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে সংঘাতে যায়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন ছিল না। বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে ওঠার পেছনে এর ভূমিকা ছিল গভীর। তাই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
যে রাষ্ট্রের ভেতর থেকে বিচ্ছেদের শুরু
১৯৪৭ সালে মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিলেন বাংলাভাষী এবং তাঁদের বসবাস ছিল পূর্ব পাকিস্তানে।
শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন সামনে আসে। ভাষার প্রশ্ন ছিল তার একটি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই ঠিক করার অধিকার।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়—সবকিছু মিলিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থান ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে রায় দিয়েছিলেন, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তা মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। তখন পরিস্থিতি আর সাধারণ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে থাকেনি। সংকট গিয়ে দাঁড়ায় অস্তিত্বের প্রশ্নে। এরপর আসে অপারেশন সার্চলাইট। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
এই ইতিহাসের দিকে তাকালে জিন্নাহকে শুধু পাকিস্তানের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে দেখানো যথেষ্ট নয়। কারণ যে পাকিস্তান তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, ভাষিক, অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে পারেনি। বাংলাদেশের জন্ম সেই ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়েই।
ইতিহাস কার?
শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তারও একটি দিক আছে। আওয়ামী লীগ বহু বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্গে এমনভাবে জুড়ে দিয়েছিল যে অনেকের কাছে মনে হয়েছে, ১৯৭১-এর ইতিহাস যেন একটি দলের সম্পত্তি হয়ে গেছে। এর সমালোচনা হওয়া দরকার ছিল।
এতে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকা এতে ছোট হয়ে যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু একজন মানুষের ইতিহাসও নয়। তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অন্য রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ এবং যুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া লাখো মানুষ—সবাই এই ইতিহাসের অংশ।
কিন্তু আওয়ামী লীগের একচেটিয়া ইতিহাসের সমালোচনা করতে গিয়ে আরেকটি ভুল করার সুযোগ নেই। যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে বৈধতা দেওয়াও ইতিহাসের সংশোধন নয়। এখানেই জিন্নাহকে ঘিরে সাম্প্রতিক কিছু আয়োজনের গুরুত্ব রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর ঢাকায় অন্তত তিনটি জিন্নাহকেন্দ্রিক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ একাডেমি জাতীয় প্রেস ক্লাবে জিন্নাহর ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠান করে। সমসাময়িক প্রতিবেদনে এটিকে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথম প্রকাশ্য আয়োজন বলা হয়।
এর কয়েক মাস পর, ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর, একই সংগঠন জিন্নাহর ১৪৮তম জন্মবার্ষিকী পালন করে। সেখানে কিছু বক্তব্য আসে, যা ১৯৭১ সালের প্রচলিত ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ সামসুদ্দিন বলেন, জিন্নাহর কারণেই বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভারত পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে আলাদা করেছে।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর একই সংগঠন আবার জিন্নাহর জন্মবার্ষিকী পালন করে। এসংক্রান্ত গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে মোহাম্মদ সামসুদ্দিনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, কায়েদে আজমের কারণেই বাংলাদেশ হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের উপস্থিতিও নজরে এসেছে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। এসব অনুষ্ঠান পাকিস্তান হাইকমিশন আয়োজন বা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে—এমন দাবি করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এটা বলা জরুরি।
কারণ প্রশ্নটি জিন্নাহকে স্মরণ করার অধিকার নিয়ে নয়। কোনো পাকিস্তানি কূটনীতিক কিংবা বাংলাদেশের কোনো নাগরিক জিন্নাহকে স্মরণ করতেই পারেন। প্রশ্নটা তখনই তৈরি হয়, যখন জিন্নাহকে স্মরণ করার সঙ্গে ১৯৭১-এর ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা যুক্ত হয়।
১৯৪৭ কি বাংলাদেশের ‘প্রথম স্বাধীনতা’?
২০২৫ সালে ‘প্রথম স্বাধীনতা’ কথাটির ব্যবহার তাই আলাদা করে নজরে এসেছে। ১৪ আগস্ট ২০২৫ ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে ১৯৪৭ সালকে ‘প্রথম স্বাধীনতা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
১৯৪৭ নিয়ে আলোচনা করতে কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং ১৯৭১ বুঝতে হলে দেশভাগ এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জানা জরুরি। কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭১ সালে।
এটা শুধু শব্দের পার্থক্য নয়। এর সঙ্গে দুটি ভিন্ন ইতিহাসের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।একটি ব্যাখ্যায় ১৯৪৭ হলো মূল ঘটনা, আর ১৯৭১ ছিল দুই মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি দুঃখজনক বিচ্ছেদ, যার পেছনে ভারতের ভূমিকা ছিল।
অন্য ব্যাখ্যায় ১৯৪৭ ছিল পাকিস্তান নামের একটি রাজনৈতিক পরীক্ষার শুরু। কিন্তু সেই রাষ্ট্র পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ ছিল সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিণতি। আজকের ইতিহাসের বিতর্কের কেন্দ্রে আসলে এই দুই ব্যাখ্যার টানাপোড়েনই রয়েছে।
জামায়াতের রাজনীতি আর ইতিহাসের প্রশ্ন
এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গও আসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা জামায়াতের ইতিহাসের কোনো ছোট ঘটনা নয়। দলটির নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। পরে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১৯৭১ সালের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন।
আজ জামায়াতের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তাদের সমর্থকেরা তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির পক্ষে কথা বলবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা আর ইতিহাসে নিজেদের ভূমিকার নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো এক কথা নয়।
একটি প্রশ্ন তাই থেকেই যায়: ১৯৭১ সালে জামায়াতের নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে কী অবস্থান নিয়েছিল? রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সেই ইতিহাসও বদলে যাবে—এটা হতে পারে না।
আবার আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে—এই সমালোচনাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রকল্পকে পুনর্বাসনের যুক্তি হিসেবেও ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
এমন কোনো ইতিহাস বাংলাদেশের প্রয়োজন নেই যেখানে শুধু মুজিব আছেন। আবার এমন ইতিহাসও আমাদের প্রয়োজন নেই যেখানে পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রকল্পকে নতুন করে ভালো চোখে দেখা হয়। আমাদের দরকার পুরো ইতিহাস।
এই দেশ কীভাবে তৈরি হলো, কেন তৈরি হলো, তার ভালো-মন্দ, গৌরব ও অস্বস্তি—সবকিছু মিলিয়ে সেই ইতিহাস। সেই ইতিহাসে জিন্নাহ থাকবেন। তাঁর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনও থাকবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন থাকবে। থাকবে সেই নির্বাচনের রায় মেনে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ইতিহাস।
থাকবে অপারেশন সার্চলাইট, গণহত্যা, প্রতিরোধ এবং ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া লাখো মানুষের কথা। মুক্তিযোদ্ধাদের কথা থাকবে। থাকবে যুদ্ধের মধ্যে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের কথাও।
আর স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ইতিহাসও আড়াল করা হবে না। ইতিহাসের সব দিক সামনে আনতে পারলেই সেটি কোনো দলের ইতিহাস না হয়ে মানুষের ইতিহাস হয়ে উঠবে।
জিন্নাহর ছবি থাকুক, কিন্তু ইতিহাসটাও থাকুক
ডাকসুর বিতর্কে তাই জিন্নাহর ছবি নামিয়ে ফেলা কোনো সমাধান নয়। বরং দরকার আরও ভালো একটি ইতিহাসের উপস্থাপন। জিন্নাহর ছবি থাকলে তাঁর ১৯৪৮ সালের ভাষা-সংক্রান্ত বক্তব্যও পাশে থাকতে হবে। তিনি কী বলেছিলেন, কেন বলেছিলেন এবং বাঙালি শিক্ষার্থীরা কেন সেই অবস্থান মেনে নেয়নি—সেটিও বলতে হবে।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব থাকলে তার পরের রাজনৈতিক ইতিহাসও থাকতে হবে। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি কীভাবে সামনে এসেছিল, পরে কীভাবে তা বদলে গেল—সেটিও বোঝাতে হবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ছবি থাকলে বলতে হবে, সেই নির্বাচনের ফল অনুযায়ী কেন ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। একটি আর্কাইভের কাজ মানুষকে নায়ক বেছে দেওয়া নয়। বরং প্রশ্ন করতে শেখানো। ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, কিন্তু সেই ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করার জায়গাটিও খোলা রাখা।
আজকের আসল বিপদ জিন্নাহর ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে ফিরে আসা নয়। বিপদ হবে যদি তাঁর ছবি ফিরে আসে, কিন্তু সেই ছবির সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসটি না থাকে। যদি না বলা হয়, কেন শেষ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার মানুষ জিন্নাহর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করেছিল।
জুলাইয়ের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসকে দলীয় মালিকানা থেকে মুক্ত করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগকে ১৯৭১-এর ইতিহাস মুছে ফেলার সুযোগে পরিণত করা যাবে না।
মুক্তিযুদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্পত্তি নয়। জামায়াতও তার ইতিহাস নতুন করে লেখার মালিক নয়।
পাকিস্তানেরও ১৯৭১-এর ব্যাখ্যা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার নেই। কোনো সরকারেরও নয়। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের। আর সে কারণেই এই দেশ কীভাবে, কেন এবং কোন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল—সেই ইতিহাস নিয়ে কোনো আপস করা চলে না।


