
উজানের ঢলে ফুলছে পদ্মা, বন্যার শঙ্কা নেই, তবু সতর্কতায় প্রশাসন
মাত্র দুই সপ্তাহে রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানির উচ্চতা বেড়েছে ২ দশমিক ০৪ মিটার (এমএসএল)। ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও নদী অববাহিকায় পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির প্রভাবে পদ্মার পানি ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। এতে মাঝনদীর ছোট ছোট চরগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করেছে, আর তীব্র স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসছে কচুরিপানা। যদিও পানি এখনো বিপৎসীমার প্রায় ৭ মিটার(এমএসএল) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং বন্যার আশঙ্কা নেই, তবু সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। একই সঙ্গে বাঁধের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও শুরু হয়েছে যৌথ অভিযান।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সরেজমিনে পদ্মাপাড় ও চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, নদীর পানি বৃদ্ধির প্রভাবে মাঝনদীর ছোট ছোট চরগুলো আংশিক তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। তীব্র স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসছে বিপুল পরিমাণ কচুরিপানা। স্থানীয়দের ভাষ্য, উজানের ঢল নামলেই সাধারণত এমন চিত্র দেখা যায়। তবে নদীর তীরবর্তী বসতিগুলো এখনো নিরাপদ রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কের পরিবর্তে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি উজানের ঢলেরই লক্ষণ।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ৯ দশমিক ৭৮ মিটার(এমএসএল)। ১৫ জুলাই দুপুরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৮২ মিটারে(এমএসএল)। জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে পানি বাড়তে শুরু করলেও ৭ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত সামান্য কমেছিল। তবে ১০ জুলাই থেকে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়।
পাউবোর শহর রক্ষা শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু হুরায়রা কালবেলাকে জানান, রাজশাহীতে পদ্মার বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার(এমএসএল)। বর্তমানে নদীর পানি বিপৎসীমার প্রায় ৬ দশমিক ৯৭ মিটার(এমএসএল) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই এখনই বন্যার আশঙ্কা নেই। তবে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
নগরীর ২৯ নং ওয়ার্ডের গাবতলী পাটুলিঘাট এলাকার নৌকার মাঝি জিয়াউর রহমান বলেন, আষাঢ়ের শেষ ভাগ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত পদ্মার পানি বাড়া স্বাভাবিক। নতুন পানির সঙ্গে কচুরিপানা ভেসে আসাও উজানের ঢলের ইঙ্গিত।
চর খিদিরপুরের বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, নিচু এলাকার কিছু অংশে পানি উঠলেও বসতিগুলো এখনো নিরাপদ রয়েছে। চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে চরাঞ্চলের মানুষ আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মাথায় রেখে শহর রক্ষা বাঁধের নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। বাঁধের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারণে ইতোমধ্যে নগরীর কেশবপুর দক্ষিণপাড়া টি-বাঁধ এলাকায় যৌথ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিজিৎ সরকারের নেতৃত্বে অভিযানে একাধিক স্থায়ী অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
অভিজিৎ সরকার কালবেলাকে জানান, একাধিকবার নোটিশ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে দখলদারদের সরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও যারা দখল ছাড়েননি, তাদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে শহর রক্ষা বাঁধের অন্যান্য অংশেও অভিযান চলবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান অঙ্কুর কালবেলাকে জানান, রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় বাঁধটি বর্তমানে নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। তবে অবৈধ স্থাপনাগুলো বাঁধের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে উজানের বৃষ্টিপাতের কারণে পদ্মার পানি আরও কিছুদিন বাড়তে পারে। তবে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই। বাঁধের কোথাও দুর্বলতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সংস্কার ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রস্তুত রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে পদ্মার পানি ১৭ দশমিক ৪৩ মিটারে পৌঁছে তালাইমারী, কাজলা, পঞ্চবটীসহ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছিল। তবে এবার এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাউবোর কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও আগাম প্রস্তুতির কারণে সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত।


