
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও মৌলিক অধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট, কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পরিবেশগত অবক্ষয় ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি ও পরিবেশ সংরক্ষণ, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাজশাহীতে কর্মরত সাংবাদিকরা।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে রাজশাহী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে পরিবেশবাদী সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত এক ওরিয়েন্টেশন সভায় মুক্ত আলোচনায় এসব কথা বলেন সাংবাদিকরা।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে ‘এনগেজ’ প্রকল্পের আওতায় এ সভার আয়োজন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও নেট্জ বাংলাদেশের আর্থিক সহায়তায় উন্নয়ন সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন সভাটির আয়োজন করে।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ডাসকো ফাউন্ডেশনের প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। প্রকল্পের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী রুহুল আমিন।
আলোচনায় অংশ নেন দৈনিক সোনার দেশ-এর সম্পাদক হাসান মিল্লাত, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহা. আব্দুল আউয়াল, রাজশাহী টেলিভিশন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শ.ম. সাজু, রাজশাহী এডিটরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব অপু, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ডালিম হোসেন শান্ত, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বিশেষ প্রতিনিধি ড. আইনাল হক ও দৈনিক নতুন প্রভাত-এর সম্পাদক সোহেল মাহবুবসহ অন্যরা। সভায় রাজশাহীতে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের ২০ জন সাংবাদিক ও পাঁচজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর অংশ নেন।
ওরিয়েন্টেশন সভায় রাজশাহী জেলার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পরিবেশগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবিলার উপায় নিয়ে মুক্ত আলোচনা হয়।
আলোচনায় রাজশাহী অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট, কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার, কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত প্রয়োগ, খাস পুকুর ভরাট, ইটভাটার দূষণ এবং প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যা উঠে আসে।
সাংবাদিকরা বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পানি সংকট দেখা দিতে পারে। তাই এখন থেকেই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও উপরস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কৃষিতে জলবায়ু-সহনশীল বা ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি ও পদ্ধতির সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
তারা বলেন, নদী ও খাল পুনঃখননে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন ও ভরাট বন্ধ, কৃষিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
বক্তারা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বরেন্দ্র অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ফলে জলবায়ু ও পরিবেশ সংকটকে কেবল উন্নয়ন বা পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে মানুষের অধিকার, স্বাস্থ্য ও জীবিকার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
সভায় গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাংবাদিকরা বলেন, পরিবেশগত সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে তথ্যভিত্তিক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাস্তবতা, পরিবেশ ধ্বংসের কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব।
সমাপনী বক্তব্যে প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সম্প্রতি সরকার ৪৭টি ইউনিয়নকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে, যা উদ্বেগের বিষয়। কাজেই আমরা আশা করি, যথাযথ লেখনীর মাধ্যমে বিষয়গুলো তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সমস্যা সমাধানের বিকল্প কী হতে পারে, তা কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে হবে।’
তিনি বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও সাংবাদিকদের ভূমিকা রাখতে হবে।


