
জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫-এ সংবিধান সংস্কার বিষয়ে যে ৪৮টি প্রস্তাব রাখা হয়েছে সেগুলো হলো—১. ভাষা : প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহৃত অন্য সব ভাষাকে দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। ২. বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয় : বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ বর্ণিত ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন’ বিধানটি নিম্নোক্তভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে : “বাংলাদেশের নাগরিকগণ ‘বাংলাদেশি’ বলিয়া পরিচিত হইবেন।” ৩. সংবিধান সংশোধন : সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের নিম্নকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে; তবে প্রস্তাবসহ সুনির্দিষ্ট কতগুলো অনুচ্ছেদ যথা—৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যা অনুচ্ছেদ ৫৮ক, ২ক পরিচ্ছেদ (৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ) হিসেবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে।
৪. সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিতকরণ ইত্যাদির অপরাধ : সংবিধানবিষয়ক অপরাধ ও সংবিধান সংশোধনের সীমাবদ্ধতাবিষয়ক বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক এবং ৭খ বিলুপ্ত করা হবে।

৫. ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি : সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০(২) সংশোধন করা হবে এবং এ সংশ্লিষ্ট পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল সংবিধানে রাখা হবে না। ৬. জরুরি অবস্থা ঘোষণা : (১) বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪১ক সংশোধনের সময় ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগের’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হবে। (২) জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বিধান যুক্ত করা হবে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণা সম্পর্কিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তাঁর অনুপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় উপনেতার উপস্থিতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। (৩) জরুরি অবস্থাকালীন নাগরিকের দুটি অধিকার অলঙ্ঘনীয় করার লক্ষ্যে এই মর্মে বিধান করা হবে যে, ‘অনুচ্ছেদ ৪৭ক-এর বিধান সাপেক্ষে কোনো নাগরিকের (ক) জীবনের অধিকার এবং (খ) বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫-এ বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না।’ ৭. মূলনীতিসমূহ : সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ উল্লেখ থাকবে। ৮. সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশ একটি বহু-জাতি-গোষ্ঠী, বহু-ধর্মী, বহুভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ, যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।
৯. মৌলিক অধিকারগুলোর তালিকা সম্প্রসারণ : নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সেগুলোর সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রস্তাবগুলো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হবে, যাতে রাজনৈতিক দলের নেতারা বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধিরা সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও আইনি বিধানাবলি পরিবর্তন করতে পারেন।
১০. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৪)-এ বর্ণিত যোগ্যতাগুলো এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না। ১১. রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নের লক্ষ্যে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)-এর সংশোধনী আনয়ন করা, যাতে কারো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারবলে রাষ্ট্রপতি নিম্নলিখিত পদে নিয়োগ প্রদান করতে পারেন : (১) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, (২) তথ্য কমিশনের প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারগণ, (৩) বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, (৪) আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, (৫) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং (৬) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ।
১২. রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। আইনসভার নিম্নকক্ষে অভিশংসন প্রস্তাবটি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করার পর তা উচ্চকক্ষে প্রেরণ এবং উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে অভিশংসনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
১৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত যেকোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত মানদণ্ড, নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণক্রমে তিনি ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। সংশ্লিষ্ট আইনে এরূপ বিধান রাখা হবে যে এরূপ কোনো আবেদন বিবেচনার আগে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করা হবে।
১৪. প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ : একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবারই হোক সর্বোচ্চ ১০ দশ বছর থাকতে পারবেন, এ জন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। ১৫. প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না। ১৬. তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা : সংবিধান সংশোধন করে নিম্নরূপ বিধান সংযুক্ত করা হবে—(১) মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। (২) সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৮খ সংশোধনপূর্বক সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ১৫ দিন আগে এবং মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভঙ্গ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। (৩) মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ৩০ দিন আগে আইনসভার নিম্নকক্ষের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় (১) প্রধানমন্ত্রী, (২) বিরোধীদলীয় নেতা, (৩) স্পিকার, (৪) ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং (৫) সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি (যদি সংসদে আসনসংখ্যার বিবেচনায় একাধিক দল দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের অবস্থানে থাকে তাহলে সেসব দলের মধ্য থেকে নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোটপ্রাপ্ত দলটিই দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হবে) মোট পাঁচ সদস্য সমন্বয়ে একটি ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ গঠিত হবে। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জাতীয় সংসদের স্পিকার সভাপতিত্ব করবেন।
(এই অংশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে) ১৭. আইনসভা গঠন : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বাংলাদেশে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে, যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) সমন্বয়ে গঠিত হবে। ১৮. উচ্চকক্ষের গঠন : (ক) নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। (খ) উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে শপথগ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর। তবে কোনো কারণে নিম্নকক্ষ ভেঙে গেলে উচ্চকক্ষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে। (গ) রাজনৈতিক দলগুলো নিম্নকক্ষের সাধারণ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সময় একই সঙ্গে উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। তালিকায় কমপক্ষে ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী থাকতে হবে। ১৯. উচ্চকক্ষের দায়িত্ব ও ভূমিকা : উচ্চকক্ষ নিম্নোক্ত দায়িত্বগুলো পালন করবে : (ক) নিম্নকক্ষের প্রস্তাবিত আইন প্রণয়নের বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকবে না; তবে কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়নের জন্য নিম্নকক্ষ বরাবর প্রস্তাব করতে পারবে। নিম্নকক্ষে পাসকৃত অর্থবিল এবং আস্থা ভোট ছাড়া সব বিল উচ্চকক্ষে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হতে হবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না। উচ্চকক্ষ কোনো বিল সর্বোচ্চ দুই মাসের বেশি আটকে রাখলে তা উচ্চকক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে। (খ) যদি উচ্চকক্ষ কোনো বিল অনুমোদন করে সে ক্ষেত্রে উভয় কক্ষে পাসকৃত বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হবে। (গ) যে ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ সংশোধনের সুপারিশসহ বিল পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে পাঠাবে সে ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষ উচ্চকক্ষের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। (ঘ) উচ্চকক্ষ থেকে ফেরত পাঠানো বিল যদি নিম্নকক্ষের অধিবেশনে আবারও পাস হয়, তবে উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য প্রেরিত হবে। (ঙ) সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যেকোনো বিল উচ্চকক্ষের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করতে হবে। ২০. উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নিম্নকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতার অনুরূপ হবে।
২১. জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব : জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে ১০০ আসনে উন্নীত করা হবে। ২২. জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির পদ্ধতি : (ক) বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল রেখে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৫(৩)-এ প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। (খ) জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিদ্যমান ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, তবে এটি সংবিধানে উল্লেখ করা হবে না। (গ) পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। (ঘ) এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ বর্ধিত হারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন অব্যাহত রাখবে। (ঙ) সংবিধানে বর্ণিত জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন অব্যাহত রেখে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর (যা ৮ জুলাই ২০১৮ সালে সংসদে পাস হয়) মাধ্যমে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২৫ বছর বৃদ্ধি করা হয়, হিসাব অনুযায়ী তা ২০৪৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে; তবে সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থিতার লক্ষ্য ২০৪৩ সালের আগেই যদি অর্জিত হয়ে যায়, তাহলে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত বিধান নির্ধারিত সময়ের আগেই বাতিল হয়ে যাবে। ২৩. ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে মনোনয়ন : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে আইনসভার উভয় কক্ষে একজন করে ডেপুটি স্পিকার সরকারদলীয় সদস্য ছাড়া অন্য সদস্যদের মধ্য থেকে মনোনীত করা হবে। ২৪. সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে।
২৫. জাতীয় সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোটদান : সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০-এর বিদ্যমান বিধান পরির্বতন করে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় সংসদের সদস্যরা কেবল অর্থবিল এবং আস্থা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকবেন। অন্য যেকোনো বিষয়ে তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। ২৬. আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনসভায় অনুমোদন : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে জাতীয় স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রভাবিত করে এরূপ আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের পর আইনসভার উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন (রেটিফাই) করা হবে।
২৭. প্রতি জনশুমারি বা ১০ বছর পর পর সীমানা পুনর্নির্ধারণ : প্রতি জনশুমারি বা অনধিক ১০ বছর পরে সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৯-এর দফা ১-এর (গ)-এর শেষে বর্ণিত ‘এবং’ শব্দটির পর ‘আইনের দ্বারা নির্ধারিত একটি অস্থায়ী বিশেষায়িত কমিটি গঠনের বিধান’ যুক্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০২১ (সর্বশেষ ২০২৫ সালে সংশোধিত)-এর ধারা ৮(৩)-এর সঙ্গে যুক্ত করে ওই কমিটির গঠন ও কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হবে। ২৮. আপিল বিভাগ থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ : সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৫-এর বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করবেন। ২৯. আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ : (১) আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগদান করবেন। (২) তবে শর্ত থাকে যে অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের অভিযোগের কারণে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬-এর অধীন কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্তপ্রক্রিয়া চলমান থাকলে তাঁকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা যাবে না। ৩০. আপিল বিভাগের বিচারকসংখ্যা : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে ‘আপিল বিভাগের বিচারকসংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রধান বিচারপতির চাহিদা মোতাবেক, সময়ে সময়ে, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারক নিয়োগ করা যাবে।’ ৩১. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন করা হবে।
৩২. সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধান : সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক নিয়োগ কমিশন সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ৩৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। ৩৪. বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ : রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে, তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে প্রধান বিচারপতি, সময়ে সময়ে, যে সার্কিট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন তার পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হবে। ৩৫. বিচারকদের পদের মেয়াদ ও তাঁদের অপসারণ : সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৬-এ বর্ণিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা ও এর এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।
৩৬. বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ : অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত করার জন্য সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৬ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করা হবে।
৩৭. স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন : সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে সংবিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা ইউনিটের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে।
সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত অন্য ১১টি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ, ন্যায়পাল নিয়োগ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ, সরকারি কর্ম কমিশনে নিয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল সংগ্রহ, সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধীনে ন্যস্ত করা এবং ৪৮. সংসদ, সংসদের কমিটি ও সদস্যদের অধিকার, অধিকারের সীমা ও দায় সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত সুপারিশ।
ন্যায়পাল নিয়োগ সংক্রান্ত সুপারিশে বলা আছে—সংবিধানের বর্তমান অনুচ্ছেদ ৭৭ সংশোধনপূর্বক ৭৭(১)-এ যুক্ত করা হবে যে, ‘এই সংবিধানের অধীনে দেশে একজন ন্যায়পাল থাকবেন।’ (খ) সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে—জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এই বাছাই কমিটির প্রধান হবেন), ডেপুটি স্পিকার (যিনি বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন), সংসদ নেতা, বিরোধী দলের নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির একজন প্রতিনিধি (নির্দলীয় ব্যক্তি এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন) এবং প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসেবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটি ন্যায়পাল পদে নিয়োগ লাভের উপযুক্ত (সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের দ্বারা যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারিত হবে) এবং এই পদে নিয়োগ লাভে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আইনের দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ অথবা তথ্য আহবান করাসহ উপযুক্ত প্রর্থীর অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করবে। বাছাই কমিটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাছাইকৃতদের মধ্য থেকে একজনকে ন্যায়পাল পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করবে; অতঃপর রাষ্ট্রপতি তাঁকে কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগদান করবেন। ন্যায়পালের যোগ্যতা-অযোগ্যতা, বয়সসীমা, কর্মের শর্তাবলি ও কর্মপরিধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা, পদত্যাগ ও পুনর্নিয়োগ লাভের সুযোগ/অধিকার ইত্যাদি সংসদের প্রণীত আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে।


