
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বস্তির আবাস পেয়েছে বিরল বামুনশালিক
ভোরের প্রথম আলো তখন ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে চিকচিক করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবুজ তৃণভূমিতে ব্যস্ত এক ছোট্ট পাখি। কখনো লাফিয়ে, কখনো দ্রুত ঠোঁট চালিয়ে মাটি থেকে তুলে নিচ্ছে পোকামাকড় আর ছোট ছোট খাদ্যকণা। দূর থেকে দেখলে সাধারণ শালিক বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু একটু কাছে গেলে চোখে পড়ে মাথার কালো ঝুঁটি, রঙিন ঠোঁট আর চোখের নিচে নীল-হলুদ অনাবৃত চামড়া। তখনই বোঝা যায়—এটি সেই বিরল বামুনশালিক, যাকে অনেকে শঙ্খশালিক নামেও চেনেন।

দেশের বহু অঞ্চল থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এ পাখির দেখা মেলে না সহজে। অথচ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে বছরের প্রায় প্রতিটি ঋতুতেই নিশ্চিন্তে বিচরণ করে বামুনশালিক। পাখি গবেষকদের মতে, নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য ও তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশের কারণেই ক্যাম্পাসটি এখন এ বিরল প্রজাতির অন্যতম আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।
খোলা তৃণভূমি, পুরোনো গাছ, ঝোপঝাড়, ভেজা মাঠ আর বিস্তীর্ণ সবুজে ঘেরা রাবি ক্যাম্পাস যেন বামুনশালিকের জন্য প্রকৃতির সাজিয়ে রাখা এক আদর্শ নিবাস। মাটিতে নেমে পোকামাকড় খুঁজে বেড়ালেও গাছের ডালে বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে বেশি পছন্দ করে তারা। অন্য শালিকের তুলনায় এদের ওড়ার গতি বেশি, আবার অন্য পাখির ডাক অনুকরণেও বেশ পারদর্শী। সাধারণত একা বা জোড়ায় দেখা গেলেও পর্যাপ্ত খাবার পেলে ছোট ছোট দলে জড়ো হয়।
আকারে মাঝারি, প্রায় ২১ সেন্টিমিটার লম্বা এ পাখির স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম। মাথাজুড়ে কালো পালক এবং ঘাড়ের পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত ঝুঁটি প্রাপ্তবয়স্ক বামুনশালিকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। শরীরের ওপরের অংশ ধূসর, গলা ও লেজে পাটকিলে আভা, আর লেজের নিচে থাকে সাদা ছোপ। শক্ত ঠোঁটের গোড়ায় নীলচে, মাঝখানে সবুজাভ ও ডগায় হলদেটে রঙের মিশেল যেন শিল্পীর তুলির আঁচড়। চোখের নিচের নীল-হলুদ অনাবৃত চামড়া এবং উজ্জ্বল হলুদ পা সহজেই আলাদা করে চিনিয়ে দেয় পাখিটিকে। তবে অল্পবয়সী বামুনশালিকের মাথায় ঝুঁটি থাকে না; তাদের শরীরের নিচের অংশও তুলনামূলক ফ্যাকাশে কমলা রঙের।
বামুনশালিক বাসা বাঁধে পুরোনো গাছের কোটর, দেয়ালের ফাঁকা অংশ কিংবা পরিত্যক্ত গহ্বরে। মানুষের ঝুলিয়ে দেওয়া কাঠের বাক্স বা মাটির হাঁড়িও কখনো কখনো তাদের নিরাপদ আবাস হয়ে ওঠে। শুকনো ঘাস, পাতা ও পালক দিয়ে বাসা তৈরি করে। সাধারণত তিন থেকে চারটি নীলচে রঙের ডিম পাড়ে। মার্চ থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত তাদের প্রজনন মৌসুম। এ সময় পুরুষ পাখি মাথার ঝুঁটি খাড়া করে সুরেলা ডাক দেয়। ফল, পোকামাকড়, ফুলের মধু এবং বিশেষ করে পাকা জাম তাদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্য।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ফাহিম মুন্তাসির রাফিনের সঙ্গে বামুনশালিকের পরিচয়ও হয়েছিল রাবি ক্যাম্পাসেই। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বামুনশালিক দেখি। তখনই ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি শুরু করেছি। পশ্চিমপাড়ায় সিরাজী ভবনের পেছনে ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁজতে দেখে প্রথম ক্যামেরাবন্দি করি। সেই মুহূর্ত থেকেই পাখিটির প্রতি আলাদা এক ভালোবাসা তৈরি হয়।
ক্যাম্পাসে এদের বিচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পশ্চিমপাড়া, সিলসিলা এলাকা, শহীদ মিনার, হেলিপ্যাড, জুবেরি এলাকা, মেইন গেটসহ প্রায় পুরো ক্যাম্পাসেই এদের দেখা যায়। তবে ডাস্টবিনের আশপাশে খাবারের প্রাচুর্য থাকায় সেখানে তুলনামূলক বেশি বিচরণ করে।
সংরক্ষণ নিয়ে রাফিনের আহ্বান, প্রজনন মৌসুমে পাখিদের বিরক্ত করা যাবে না, বাচ্চা ধরা যাবে না। কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করলে তার প্রতিবাদ করতে হবে। একই সঙ্গে বাইরে থেকে এসে কেউ যাতে পাখির বাচ্চা চুরি করতে না পারে, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পাখি গবেষক ড. আমিনুজ্জামান মো. সালেহ রেজা বলেন, খাদ্য, নিরাপদ আবাস, নিরাপত্তা ও অনুকূল পরিবেশ—এই চারটি বিষয় একটি পাখির টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাবি ক্যাম্পাসে এই চারটি উপাদানই রয়েছে। তাই বামুনশালিক এখানে শুধু বসবাসই করছে না, নিয়মিত প্রজননও করছে।
তিনি বলেন, একটি পাখি যেখানে নিরাপদ বোধ করে, সেখানেই প্রজনন করে। মার্চ থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত বামুনশালিকের প্রজননকাল। এ সময় প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত থাকায় তারা ক্যাম্পাসেই বংশবিস্তার করে।
দেশের সব এলাকায় এ পাখি দেখা না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, একেক অঞ্চলে একেক প্রজাতির পাখির আধিক্য থাকে। সুন্দরবন বা চট্টগ্রামে যেসব পাখি বেশি দেখা যায়, সেগুলো রাজশাহীতে পাওয়া যায় না। আবার বামুনশালিকের উপস্থিতি রাজশাহী অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করণীয় প্রসঙ্গে এই গবেষকের ভাষ্য, নতুন কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। শুধু এদের আবাসস্থল যেন নষ্ট না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ অনুকূল থাকলে পাখিরা নিজেরাই এখানে টিকে থাকবে; পরিবেশ নষ্ট হলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যত্র চলে যাবে।
প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সেই ব্যস্ততার মাঝেও নিশ্চিন্তে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় বিরল বামুনশালিক। প্রকৃতির এই নীরব অতিথি যেন মনে করিয়ে দেয়—জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে বড় কোনো আয়োজনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, সবুজের প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের সচেতনতা। সেই সচেতনতা বজায় থাকলে রাবি ক্যাম্পাস ভবিষ্যতেও বিরল এই পাখির নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকবে।


