
এক রাতে তলিয়ে গেল নৌকা-জাল, আহত মাঝি ও তাঁর স্ত্রী; ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারে খাদ্য ও চিকিৎসা সহারিহি
রাতের আঁধারে হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠে পদ্মা। মুহূর্তেই একের পর এক বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে রাজশাহীর টি-বাঁধ এলাকায়। তীরে বাঁধা নৌকাগুলো দুলতে শুরু করলে প্রাণপণে সেগুলো রক্ষার চেষ্টা করেন মাঝি-জেলেরা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ঢেউয়ের তোড়ে একটি নৌকা ভেসে যায়, আরেকটি তলিয়ে যায় নদীর গভীরে। নৌকার সঙ্গে পানিতে হারিয়ে যায় মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম। নৌকা বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন এক মাঝি ও তাঁর স্ত্রী। এক রাতেই জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন কয়েকটি পরিবার।

গত বুধবার রাতের সেই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মাঝি-জেলেদের পাশে দাঁড়িয়েছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে টি-বাঁধের বটতলা এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। পরে তাঁদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী ও চিকিৎসার জন্য নগদ আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন তিনি।
হঠাৎ বড় ঢেউ, চোখের পলকে তলিয়ে গেল নৌকা
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার রাত ১০টার দিকে টি-বাঁধ এলাকার পদ্মায় হঠাৎ বড় বড় ঢেউ সৃষ্টি হয়। ঢেউয়ের তীব্রতায় তীরে বাঁধা নৌকাগুলো প্রচণ্ডভাবে দুলতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঝি-জেলেরা নৌকা রক্ষায় ছুটে যান। একপর্যায়ে ঢেউয়ের ধাক্কায় একটি নৌকা ভেসে যায়। আরেকটি নৌকা জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জামসহ তলিয়ে যায় পদ্মায়।
নৌকা ভেসে যাওয়া ঠেকাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন রিমোন হোসেন ও তাঁর স্ত্রী। প্রতিবেশী শাহজামাল মাঝির নৌকা রক্ষার চেষ্টা করার সময় নৌকার ধাক্কায় রিমোনের পা ভেঙে যায়। পরে ঘটনাস্থলেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। গুরুতর আহত হওয়ায় বর্তমানে কোনো কাজ করতে পারছেন না রিমোন।
‘সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম’
আহত রিমোন হোসেন বলেন, ‘পায়ের এই অবস্থায় কোনো কাজ করতে পারছি না। সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। আজ ডিসি স্যার নিজে এসে পরিবারের জন্য এক মাসের খাবার ও চিকিৎসার নগদ টাকা দিয়েছেন। এই বিপদের সময়ে এটি আমাদের বড় ভরসা।’
নৌকা রক্ষার সময় সহযোগিতা করায় রিমোন দম্পতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শাহজামাল মাঝি। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ এত বড় ঢেউ উঠবে, কল্পনাও করিনি। ডিসি স্যার এসে আমাদের কষ্টের কথা শুনেছেন। দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন—এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।’
নৌকা-জালসহ আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি
তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন জারজিস মাঝি। পদ্মার ঢেউয়ে তাঁর একমাত্র নৌকাটি জাল ও অন্যান্য মাছ ধরার সরঞ্জামসহ পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। তাঁর দাবি, এতে প্রায় আড়াই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জারজিস মাঝি বলেন, ‘সর্বনাশা পদ্মার ঢেউ এক রাতেই আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। এই নৌকাই ছিল পরিবারের আয়ের একমাত্র পথ। তবে ডিসি স্যার খোঁজ নিয়ে খাবার ও আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ায় অনেক উপকার হয়েছে।’
জেলে-মাঝিদের ভাষ্য, নদীতে মাছ ধরাই তাঁদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। নৌকা, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম হারিয়ে যাওয়ায় শুধু তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতিই নয়, তাঁদের নিয়মিত আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। আহত রিমোনের মতো কর্মক্ষম ব্যক্তির কাজ বন্ধ থাকায় তাঁর পরিবারও পড়েছে বাড়তি সংকটে।
‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সার্বিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে’
শনিবার সকালে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলার পর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, বুধবার রাতে হঠাৎ সৃষ্ট ঢেউয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সার্বিক খোঁজখবর নিতে এসেছেন তিনি। তাদের খাদ্যসামগ্রী ও চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পদ্মার পানি বৃদ্ধি এবং চরাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে পবা উপজেলার মধ্যচরের ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, নদী ও চরাঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর প্রশাসনের নজর রয়েছে। দুর্গত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী ও নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. আরিফ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।


