
রাজশাহীতে নভেম্বরের শুরুতে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে বিভিন্ন উপজেলাগুলোয় ফসলের মাঠজুড়ে পানিবন্দি হয়েছে। হঠাৎ টানা দুই দিনের অতিবৃষ্টিতে জেলার হাজারো কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শাকসবজি, ঢেঁড়স, মুলা, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে আমন ধানসহ সব ফসলেই পড়েছে ধ্বংসের ছাপ। অতিবৃষ্টিতে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষেতের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৪ হাজার দুইশো কৃষক। এই বিপুল ক্ষতি কিভাবে কাটিয়ে উঠবেন তা নিয়ে কৃষকের চোখে মুখে হতাশার ছাপ ফুটে উঠেছে।

রাজশাহীতে অতিবৃষ্টিতে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকার ক্ষেতের ফসল নষ্ট
বাগমারায় ভারিবর্ষণে ক্ষতি সইতে না পেরে স্ট্রোক করে কৃষকের মৃত্যু
অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৪ হাজার ২০০ কৃষক
কৃষি বিভাগ বলছে, রাজশাহীতে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকারও বেশি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজারের ওপর। শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাত থেকে শনিবার (১ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় প্রায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এই দুই দিনে বৃষ্টিতে জেলার ২ হাজার ১৫০ বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসময়ে এই দুই দিনের বৃষ্টিতে রাজশাহী জেলার ৪ হাজার ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সরজমিনে দেখা যায়, রাজশাহীর অন্যান্য উপজেলার মতো পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর, তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে এখনো পানি জমে আছে। এমন সময়ে বৃষ্টিতে হতবাক কৃষকেরা বলছেন, ১৯৮৬ সালের পরে এই এলাকায় নভেম্বর মাসে শুরুতে এতটা বৃষ্টি আগে কখনো দেখেননি।
অতিবৃষ্টিতে ক্ষতির বিষয়ে জানতে কথা হয় রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার গ্রামের কৃষি পণ্যের বণিক ব্যবসায়ী দেরাজ আলীর সাথে। তিনি বলেন, একসময় যেই জমিতে ভরে উঠেছিল শাকসবজি, ঢেঁড়স, মুলা, পেঁয়াজ সেই জমি এখন ডুবে আছে বৃষ্টির পানিতে। হাতভর্তি মুলার আশা এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জমিতেই। তিনি আরো বলেন, আষাঢ় মাসেও এমন বৃষ্টি হয় না, যে বৃষ্টি হইছে। এখনো পানি নামেনি। আরো পাঁচ বিঘা জমি এখনো পানিবন্দি, জমির চারিদিকে পুকুর তাই পানি নামতে পারছে না।
এদিকে পান বরজে গত শনিবার সকালে গিয়ে মাজা পরিমান পানি জমা ও ক্ষতির পরিমান সইতে না পেরে বাগমারার নন্দনপুরের নুর মোহম্মাদ নামে এক কৃষক স্ট্রোক করে মারা যায়। এ ব্যাপারে বাগমারা উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুর রাজ্জাক মানবকণ্ঠকে জানান, বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। অসময়ে বৃষ্টিতে শাক-সবজি, মরিচসহ বেশ কিছু ফসলচাষিরা লাভবান হবার কথা থাকলেও প্রচুর পরিমান বৃষ্টিতে কৃষকরা এবার প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরো বলেন, বাজারে মুলা তোলার আগেই সব শেষ হইয়া গেলো। ক্ষেতে এখন শুধু পানি আর পানি। তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এতো ক্ষতি কিভাবে কাটিয়ে উঠকে বুঝতে পারছি না।
এদিকে পবা, দুর্গাপুর, মোহনপুর, বাগমারা, গোদাগাড়ি উপজেলাসহ অধিকাংশেরই একই চিত্র। মাঠজুড়ে এখন পানি আর পানি। কারও জমিতে ধান হেলে পড়েছে, কারও জমিতে শাকসবজি পানির নিচে ডুবে আছে। বৃষ্টিতে মাঠজুড়ে এখন ক্ষতির চিহ্ন।
চারঘাট উপজেলার পাইটখালী এলাকার কৃষক আবু সাঈদ হিরু বলেন, ১২ কাঠা জমিতে শাকসবজি করেছিলাম। বৃষ্টিতে সব শেষ হইয়া গেছে। এমন সময় তো বৃষ্টি হয় না। এখন আবার নতুন করে লাগাইতে সময় লাগবে।
দুর্গাপুর উপজেলার সিংগা গ্রামের কৃষক জাহিদ জানান, সিংগা বিলে প্রায় আধা পাকা দুই বিঘা জমির ধান গত শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) এর রাতের বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। আর এক সপ্তাহ হলেই তার ধান কাটা শুরু হতো। এ সময় হঠাৎ রাতের বৃষ্টিতে সব ধান তলিয়ে গেছে। এখন পানি কমতে শুরু করেছে। শুক্রবারের (৩১ অক্টোবর) বৃষ্টিতে দুই বিঘা জমিতে পানি জমে গেছে।
অতিবৃষ্টিতে ক্ষতির পরিমাণ জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, নিম্নচাপের কারণে নভেম্বরের শুরুতেই অপ্রত্যাশিতভাবে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। মাত্র দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার ২ হাজার ১৫০ বিঘা জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। তিনি আরো জানান, ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শাকসবজিতে ২৬৭ লাখ টাকা, রোপা আমনে ১১৬ লাখ টাকা, পেঁয়াজে ১২৭ লাখ টাকা ও সরিষায় ১৮৫ লাখ টাকার। মোট প্রায় ৪ হাজার ২০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের তথ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এবিষয়ে মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিবে, তা বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতার বিষয়ে পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এমএ মান্নান জানান, নভেম্বরের শুরুতেই যে বৃষ্টি হয়েছে, সেটি মূলত নিম্নচাপজনিত। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি যেন জমি শুকিয়ে দ্রুত নতুন ফসল লাগাতে পারেন। ইতোমধ্যে কৃষকদের সরিষা, গম, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন ধরনের ফসলের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, গরিব কৃষকের জন্য প্রণোদনাই এখন একমাত্র ভরসা। সরকার যদি ক্ষতিগ্রস্থ কৃসকদের পাশে থাকে তাহলে আবারো মাঠে ফসল তুলতে পারবে বলে আশাবাদী তারা।


