
৩ বছরের নীতিমালা, একই স্টেশনে ২০ বছর!
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের নিজস্ব ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা-২০২৩’ উপেক্ষা করে প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তাকে একই স্টেশনে বছরের পর বছর রেখে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পদায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।

সম্প্রতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত বদলি নীতিমালা এবং ১০৭ কর্মকর্তার বদলি-সংক্রান্ত অভিযোগের একটি নথি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। ওই নথিতে নীতিমালার নির্দেশনা অমান্য করে একই স্টেশনে পুনঃপদায়ন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল রাখা এবং বাছাই করে বদলির মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরির অভিযোগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বদলি আদেশে প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হলেও দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারকারী একটি গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যের ক্ষেত্রে নীতিমালার প্রয়োগ হয়নি। বরং তাদের অনেককেই আবার প্রধান কার্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন করা হচ্ছে।
এতে ব্যাংকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরোনো প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলে আশঙ্কা করছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
তিন বছর পর বদলির বিধান
রাকাবের ২০২৩ সালের বদলি ও পদায়ন নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একই কর্মস্থলে টানা তিন বছরের বেশি রাখা যাবে না। প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয়, জোনাল কার্যালয় এবং একই শহরের শাখাগুলোকে একই স্টেশন হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
নীতিমালায় একই স্টেশনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পদায়নের সুযোগ না রাখার পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রয়োজন ছাড়া কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিশেষ সুবিধা না দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে নীতিমালার এসব বিধানের একাধিকটি অনুসরণ করা হয়নি।
অভিযোগপত্রে ১২ জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে একই স্টেশনের আওতায় চাকরি করছেন। আবার কাউকে প্রধান কার্যালয়ের একটি বিভাগ থেকে একই প্রধান কার্যালয়ের অন্য বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। কয়েকজনকে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই একই স্টেশনের অন্য দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, শুধু বিভাগ বা দপ্তরের নাম পরিবর্তন করে পদায়ন দেখানো হলেও কর্মস্থল বাস্তবে পরিবর্তন হয়নি।
দূরবর্তী এলাকায় বদলি, সুবিধাভোগীরা বহাল
রাকাবের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একই প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়নে দুই ধরনের নীতি কার্যকর রয়েছে। কেউ বছরের পর বছর প্রধান কার্যালয়ে থেকে সুবিধাজনক পদে থাকছেন। আবার দীর্ঘদিন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তার বদলির আবেদন উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তাঁদের অভিযোগ, একই ধরনের অবস্থানে থাকা অনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও প্রভাবশালী কয়েকজনকে একই স্টেশনে রেখে শুধু বিভাগের নাম পরিবর্তন করে পদায়ন দেখানো হয়েছে।
এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতি আস্থাও কমছে বলে দাবি তাঁদের।
রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ
বদলি-পদায়নে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিএনপি-সমর্থক হিসেবে পরিচিত অথবা বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নন—এমন কয়েকজন কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দূরবর্তী ও অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বদলি করা হয়েছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত কয়েকজনকে সুবিধাজনক পদায়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বদলি বা পদায়নের এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ হয়নি।
পর্ষদে লিখিত অভিযোগের পরামর্শ
অভিযোগের বিষয়ে রাকাবের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ কালবেলাকে জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে আমরা দেখি না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বের মধ্যেই রয়েছে।
তিনি বলেন, বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন বা অনিয়মের কোনো অভিযোগ থাকলে তা চেয়ারম্যান বরাবর লিখিতভাবে জানানো যেতে পারে। চেয়ারম্যান অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে তা পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করতে পারেন। এরপর পর্ষদে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বক্তব্য দেননি ভারপ্রাপ্ত এমডি
বদলি ও পদায়নে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে রাকাবের ডিএমডি ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মোর্তুজার বক্তব্য জানতে অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগগুলোর বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
অভিযোগকারীরা বদলি ও পদায়নের পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও রাকাব পরিচালনা পর্ষদের কাছে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।


