
দলীয় চাপে বিব্রত ইউএনওরা, উপজেলায় উপজেলায় বিক্ষোভ-অভিযোগ
দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি মাঠে গড়ানোর আগেই রাজশাহীতে শুরু হয়েছে নিয়োগের ‘তুঘলকি কাণ্ড’। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব, কোথাও দলীয় সুপারিশ, আবার কোথাও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীকেও বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগের তালিকা বাতিল ও পুনর্নিয়োগের দাবিতে একের পর এক উপজেলায় বিক্ষোভে নেমেছেন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এমনকি ইউএনওদের অপসারণের দাবিও উঠেছে। ফলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করার এই কর্মসূচির শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছে—ফ্যামিলি কার্ডের মাঠকর্মী বাছাইয়ে যোগ্যতা ও নীতিমালা প্রাধান্য পাচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও তদবির?

জেলার গোদাগাড়ী, তানোর, বাগমারা, চারঘাট ও বাঘায় নিয়োগ ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি। অভিযোগের তীর কখনো আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্তদের নিয়োগের দিকে, আবার কোথাও বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ না করার অভিযোগও সামনে এসেছে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তার একটি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কয়েকটি উপজেলায় বিক্ষোভকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। কোথাও নিয়োগের ফল বাতিলের দাবি উঠেছে, কোথাও আবার ইউএনওর অপসারণও চাওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও পড়েছেন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে।
তবে সংশ্লিষ্ট ইউএনওরা বলছেন, নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে কাউকে নিয়োগ বা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনও বলছে, নীতিমালা মেনেই নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গোদাগাড়ীতে বিক্ষোভ, যাচাইয়ের দাবি
রোববার গোদাগাড়ীতে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে সমাবেশ শেষে তাঁরা ইউএনওর কার্যালয়ে যান। সেখানে নিয়োগের তালিকা ও প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান তাঁরা।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, যোগ্যতা ও মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় এবং প্রভাবশালী মহলের সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করা হয়নি।
তানোরে ১০৫ পদে তালিকা প্রকাশের পর উত্তাপ
তানোরে ৯৬ জন তথ্য সংগ্রহকারী ও ৯ জন সুপারভাইজার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পরই নতুন করে বিতর্ক দেখা দেয়। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ না করে একটি পক্ষের প্রভাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন তাঁরা। নিয়োগের তালিকা বাতিল করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পুনরায় নিয়োগের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খানের অপসারণের দাবিও তোলেন বিক্ষোভকারীরা।
অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও নাঈমা খান বলেন, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করেই ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কারও নিয়োগে অসংগতি পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাগমারায় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
বাগমারাতেও একই ধরনের অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মঙ্গলবার মানববন্ধন করেন। তাঁদের অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় ইউএনও ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলেন তাঁরা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নীতিমালা অনুসরণ করে করা হয়েছে। এখানে পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই।
চারঘাটে উত্তীর্ণ হয়েও বাদ পড়ার অভিযোগ
চারঘাটে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ আরও গুরুতর। কয়েকজন প্রার্থীর দাবি, লিখিত পরীক্ষা ও অন্যান্য ধাপ পেরিয়েও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে তাঁদের বাদ দেওয়া হয়েছে। উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তাঁদের অভিযোগ, যোগ্যতা থাকলেও রাজনৈতিক তদবির ছাড়া নিয়োগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে মেধাভিত্তিক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি রাজশাহী মহিলা কলেজের এক অনার্স শিক্ষার্থীকে ঘিরে। ওই শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত আখ্যা দিয়ে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে চারঘাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রাশেদুজ্জামান বলেন, গোয়েন্দা তদন্ত প্রতিবেদনে ওই শিক্ষার্থীকে মাদকাসক্ত বলা হয়েছে।
চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অবৈধভাবে কাউকে নিয়োগবঞ্চিত করা হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কোনো অভিযোগ করেছেন কি না, তা তাঁর জানা নেই।
বাঘায় পরীক্ষা থেকেই বিতর্ক
বাঘায় ফ্যামিলি কার্ডের জনবল নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক শুরু হয় পরীক্ষার সময় থেকেই। প্রার্থীদের একাংশ দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ ও সার্ভার জটিলতার অভিযোগ তোলেন। ফল প্রকাশের পর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন।
পরিস্থিতির পর ফলাফল স্থগিত করা হয় এবং আবেদনের সময় বাড়ানো হয়। একই সময়ে ইউএনওকে বদলি করা হয়। তবে বাঘার ইউএনওর বদলির সঙ্গে বিক্ষোভের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর ভাষ্য, বদলি একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ।
দলীয় চাপের মুখে মাঠ প্রশাসন?
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার ঘটনাগুলো পাশাপাশি রাখলে ফ্যামিলি কার্ডের জনবল নিয়োগ নিয়ে একটি অভিন্ন চিত্র সামনে আসে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগ এখন আর শুধু চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিযোগিতার বিষয় থাকছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সুপারিশ এবং প্রশাসনের ওপর চাপের অভিযোগ।
একদিকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগের অভিযোগ করছেন। অন্যদিকে তাঁদের পক্ষ থেকেও নিজেদের কর্মীদের ‘মূল্যায়ন’ করার দাবি ওঠার অভিযোগ রয়েছে। ফলে যে কর্মসূচির মূল লক্ষ্য দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, তার শুরুতেই যদি রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
‘রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নীতিমালাই ভিত্তি’
সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রায় একই—নীতিমালা মেনেই নিয়োগ হয়েছে এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের সুযোগ নেই। তাঁদের দাবি, অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা হবে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহীদুল ইসলাম বলেন, আমি বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি দেখেছি। আমাদের ইউএনওদের নিয়োগের সম্পূর্ণ নীতিমালা অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সেটাই করছেন। এখানে অনিয়ম করার সুযোগ নেই।
তবে একই সঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, ফ্যামিলি কার্ডের এই নিয়োগে আবেদন প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হলে পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা যেত।
শুরুতেই প্রশ্নের মুখে ফ্যামিলি কার্ড
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। কারণ তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হবে সুবিধাভোগী পরিবারের তথ্যভান্ডার। সেখানে মাঠকর্মী নির্বাচনেই যদি রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব কিংবা তদবিরের অভিযোগ ওঠে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সংগৃহীত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের জনবল নিয়োগে কোনো দলের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় এলে পুরো কর্মসূচির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড যেহেতু সরাসরি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য, তাই এখানে দলীয় আনুগত্য নয়—যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচনা।
রাজশাহীতে নিয়োগ নিয়ে একের পর এক বিক্ষোভ, অভিযোগ, ফল বাতিলের দাবি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিতর্ক নয়; এটি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার জন্যও একটি বড় সতর্কসংকেত।


