
দেশজুড়ে মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও কার্যত এ ধরনের অপরাধ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সংঘবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলা বা গণপিটুনির মতো বর্বরতা ঘটেই চলেছে। সরকারের ঘোষণার পরও এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় পুলিশের মধ্যেও অস্বস্তি রয়েছে।

সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার পরও এই ‘মব সন্ত্রাস’ পুরোপুরি ঠেকাতে না পারার বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্যে নানা সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। তারা বলছেন, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ধাক্কা পুলিশ এখনো পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি। তা ছাড়া কোনো এলাকায় মবকারীদের তুলনায় তা প্রতিরোধে পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা কম হওয়ায় তা দ্রুততম সময়ে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব হচ্ছে না। মব সন্ত্রাসের অনেক ঘটনাই পূর্ব পরিকল্পিত। বেশির ভাগ ঘটনায় মবকারীরা সাইবার স্পেসে অতি দ্রুত গুজব রটিয়ে মব সংঘটিত করতে পারলেও খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অপরাধ সংঘটিত হয়ে যাচ্ছে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা নিয়েই ‘মব ভায়োলেন্স’ বন্ধে সাইবার স্পেসে নজরদারি ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোসহ নানা উদ্যোগ নিয়ে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মব সন্ত্রাস বন্ধ না হওয়ায় তাদেরও অতিরিক্ত চাপ ও ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ উচ্ছৃঙ্খল জনতা থামাতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে হামলার শিকার হতে হচ্ছে পুলিশকেও।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় পুরো মেয়াদই উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলা বা উচ্ছৃঙ্খলতার নানা ঘটনা চলতে থাকে। ওই সময় এসব ঘটনা ‘মব সন্ত্রাস’ বা ‘মব কালচার’ হিসেবে পরিচিতি পায় এবং তাতে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়। যদিও গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করার পর মব সন্ত্রাস কমে আসে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একাধিকবার এ মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেন এবং এক্ষেত্রে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের কঠোর বার্তার পরও মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর মতো ঘটনা মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে। উগ্রবাদবিরোধী অভিযানে অভিজ্ঞ ইউনিটগুলোকে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ ও উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক কৌশলে দক্ষ করে তোলারও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দ্বিধা দূর করে আইনসম্মতভাবে প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য বলে জানালেন পুলিশ কর্তারা।
যদিও গত শনিবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে মবের হামলায় এক ‘পীর’ নিহত হন। এরপর মব সহিংসতার ভয়াবহতা ফের সামনে আসে। এর কয়েকদিন আগেই রাজধানীর শাহবাগ এলাকায়ও সংঘবদ্ধ হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দৌলতপুরের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ‘পীর’ শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরের আস্তানায় হামলা চালিয়ে তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি ঘটে। তবে উত্তেজনার খবর সকালেই জানতে পেরেছিল স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ। ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিও ছিল। তবে লাঠিসোঁটা, রড ও ধারালো অস্ত্র হাতে শতাধিক মানুষের মব থামাতে পারেনি পুলিশ। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে মবের ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও তাণ্ডব চললেও প্রশাসন ছিল অনেকটা নীরব দর্শকের মতো।
কুষ্টিয়ার ঘটনাটির পর কালবেলার পক্ষ থেকে পুলিশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা রেঞ্জে মাঠপর্যায়ের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, অধিকাংশ ঘটনায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব, লাইভ ভিডিও এবং উসকানিমূলক পোস্ট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক সময় প্রাথমিক তথ্য পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো পুলিশকে উল্টো জনরোষের মুখে পড়তে হয়। পুলিশ সদস্যরাও হামলা, ঘেরাও এবং হেনস্তার শিকার হন। অনেক ঘটনায় পুলিশের ওপর সরাসরি আক্রমণ ও বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে ফের মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়েছে।
পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যেসব তথ্য: মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে উচ্ছৃঙ্খল জনতার পিটুনিতে সারা দেশে অন্তত ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, যেখানে নিহতের সংখ্যা ১৪ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ জন। এরপর খুলনা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জন করে নিহত হন। রংপুর ও বরিশাল বিভাগে নিহত হয়েছেন ৩ জন করে। অবশ্য ওই তিন মাসে সিলেট বিভাগে গণপিটুনিতে কোনো প্রাণহানির তথ্য মেলেনি।
আসকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে গত জানুয়ারি মাসে দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে সাত জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে তিনজন, চট্টগ্রাম বিভাগে দুই এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে একজন করে প্রাণ হারান। তবে ওই মাসে সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে গণপিটুনিতে মৃত্যুর তথ্য মেলেনি।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে গণপিটুনিতে মোট ৯ জন নিহত হন। তবে মার্চ মাসে দেশে গণপিটুনি এবং এ ধরনের অপরাধে হতাহতের ঘটনা বেড়ে যায়। এ মাসে দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ২০ জন নিহত হন।
অবশ্য ২০২৪ সালে দেশে মব সহিংসতায় গণপিটুনীতে ১২৮ জনের মৃত্যু হয়। ওই বছরের আগস্ট মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিসেম্বর পর্যন্ত এ পাঁচ মাসেই নিহত হন ৯৬ জন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৮ জনে।
আসকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ২১১টি মব-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৪৮৭টি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর হয় এবং ৮৮টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পাশাপাশি ১১৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ৪৭টি মন্দির-মঠে ভাঙচুর এবং ১৯৪টি প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হন বলেও আসকের তথ্য বলছে।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত মব-সম্পর্কিত ঘটনায় দেশে শতাধিক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ছিল বড় ধরনের সংঘবদ্ধ হামলার মামলা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে এ ধরনের অপরাধ কমে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মব নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপের বাইরে গিয়ে কাজ করতে দিতে হবে। এ মবের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে এ ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তিই ঘটবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন কালবেলাকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মবকারীরা মারামারি, ভাঙচুর কিংবা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে এসব ঘটনার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। পাশাপাশি ঘটনাগুলো ঠেকাতে আগাম নানা কার্যক্রমও চালানো হয়।
তিনি আরও বলেন, জনতার তুলনায় পুলিশের সদস্যসংখ্যা কম। এর মধ্যে অপারেশনাল কাজে নিয়োজিত পুলিশের সংখ্যা আরও কম। দেখা যাচ্ছে, একটি জেলায় কোনো থানায় পুলিশের সংখ্যা ২০ জন, সেখানে মব করতে জড়ো হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এসব ক্ষেত্রে কন্ট্রোল করতে আমাদের সমস্যা হয়। এটা আমাদের একটি দুর্বলতার জায়গা।


