
আব্দুল্লাহ আল শামস, স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী (দূর্গাপুর)

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহী–৫ (পুঠিয়া–দূর্গাপুর) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার ভোটের হিসাব জটিল হয়ে উঠেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণে এখানে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে। বিরোধী ভোটের বিভাজন ও মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তিই চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল আপাতত ভোটের সমীকরণে এগিয়ে থাকলেও তাঁর অবস্থান পুরোপুরি নিরাপদ নয়। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান সংগঠিত প্রচারণা ও স্থির ভোটব্যাংকের কারণে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসফা খায়রুল হক শিমুল ও ব্যারিস্টার রেজাউল করিম শেষ মুহূর্তে ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
রাজশাহী অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির অন্যতম ভোটভিত্তিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলায় দলটির সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তৃত এবং মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দৃশ্যমান। গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি ঐতিহ্যগত সমর্থন এখনো বিএনপির বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে যে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও বিভক্তির ইঙ্গিত মিলছে, তা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি বিএনপির একটি অংশের ভোট বিচ্ছিন্ন করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি প্রার্থী এই আসনে মোট ভোটের ৩৮ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পেতে পারেন। তবে এই ব্যবধান ধরে রাখা অনেকটাই নির্ভর করবে দলীয় ঐক্য ও শেষ মুহূর্তের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মনজুর রহমান এই নির্বাচনে সবচেয়ে সংগঠিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছেন। দলটির ভোটাররা সাধারণত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও স্থির থাকেন, যা জামায়াতকে একটি শক্ত অবস্থানে রেখেছে। ধর্মভিত্তিক ও আদর্শিক ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাঁর পক্ষে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির ভোট যদি বড় পরিসরে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে জামায়াত সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারে। তবে সামগ্রিক বিচারে এই আসনে জামায়াতের সম্ভাব্য ভোটের হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসফা খায়রুল হক শিমুল ও ব্যারিস্টার রেজাউল করিম সরাসরি জয়ের দৌড়ে না থাকলেও তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাঁদের ‘কিং মেকার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপির ভেতরের অসন্তুষ্ট ভোটারদের একটি অংশ স্বতন্ত্রদের দিকে ঝুঁকে পড়লে পুরো নির্বাচনের ফলাফল বদলে যেতে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজশাহী–৫ আসনে এখন পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল এগিয়ে রয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী শক্ত দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ফলাফলের ভারসাম্য নষ্ট করার প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
সব মিলিয়ে রাজশাহী–৫ আসনের নির্বাচন এবার কেবল দলীয় শক্তির লড়াই নয়। অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও কৌশলগত ভোটের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে এই আসনের লড়াই। শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মালা কার গলায় উঠবে, তা নির্ধারিত হবে ভোটের দিনই।


