
বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাণদায়িনী এক সময়ের সুপরিচিত পদ্মা নদী ছাড়াও বেশ কয়েকটি নদী দখল ও দূষণের কারণে অস্তিত্বসংকটে আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। রাজশাহীর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া আরও কয়েকটি নদী যেমন বারাহী নদী, স্বরমঙ্গলা নদী, নবগঙ্গা নদী, বারনই নদী ও হোজা নদী ধীরে ধীরে বর্জ্যবাহী নালায় পরিণত হচ্ছে। এসব নদীর সঙ্গে যুক্ত অন্তত ছয়টি বিলও দূষণের শিকার হচ্ছে।

নদীগুলো রক্ষায় বিভিন্ন সমন্বিত পদক্ষেপের দাবি জানানো হলেও কতৃপক্ষের সুনজর পড়তে দেখা যায়নি। এক সময় এই নদীর পানি রান্না-গোসলের কাজে ব্যবহার করা হলেও এখন সেই পানি স্পর্শ করতেও মানুষ ভয় পায়। রাজশাহীর লাইফলাইনে থাকা নদীগুলোর পচা পানির দুর্গন্ধে এলাকায় বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীর পানি অনেক জায়গায় আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে। নদীগুলোর পার্শ্ববর্তী স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াসহ যাতায়াতে অসুবিধা দেখা দিয়েছে। প্রায়ই মরা মাছ ভেসে উঠতে দেখা যায় নদটিতে। এর প্রধান কারণ হলো রাজশাহী নগরীর অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগরীর বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে।
রাজশাহীর নদীগুলো এখন বর্জ্যবাহী ড্রেন
হাসপাতাল ও কারখানার বর্জ্যে প্রাণ সংকটে রাজশাহীর নদী
হাসপাতাল এবং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যও যাচ্ছে নদীতে। এই পানি ব্যবহার করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের শরীরে দেখা দিচ্ছে চর্মরোগ। দূষিত পানি কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।

রাজশাহী বারাহী নদী পদ্মা থেকে উৎপন্ন হয়ে শহরের ভেতর দিয়ে বায়া বাজার হয়ে বারনই নদীতে মিশেছে। একইভাবে স্বরমঙ্গলা ও নবগঙ্গা নদীর সব বিষাক্ত বর্জ্য শেষ পর্যন্ত পবা উপজেলার বায়া এলাকায় বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। নদীর মোহনায় গিয়ে দেখা যায়, কুচকুচে কালো পানির ওপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন আর কেমিক্যাল মিশ্রিত ফেনা। স্থানীয়দের দাবি, এই দূষণ নাটোরের চলনবিল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
জানা যায়, বারাহী নদী পদ্মা নদী থেকে নিউমার্কেটের কাছ দিয়ে বয়ে গেছে। নদীটি নগরীর মুন্নুজান স্কুলের পাশ দিয়ে পদ্মা থেকে উৎপন্ন হয়ে সিটি ভবনের পশ্চিম পাশ দিয়ে রেলভবন, পলিটেকনিক, বিজিবি ক্যাম্প হয়ে বায়াবাজার দিয়ে বারনই নদীর সঙ্গে মিলেছে। বারাহী নদীতে এক সময় পালতোলা নৌকা চলত। জেলেরা মাঝ ধরত। নদীটি এখন মৃত। সিটি করপোরেশনের সব বর্জ্য পানি ও মেডিকেল বর্জ্য এই মৃত নদীতে সরু খালের মতো প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে বারনই নদীতে। এলজিইডি ২০২৩ সালে নদীটির নাম “পাকুরিয়া খাল” হিসেবে উল্লেখ করে বায়ার পালপাড়ায় ২৪ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু করেছে। সরজমিনে এই সেতুর নিচে গিয়ে দেখা যায় শহরের কালো বর্জ্য পানি প্রবাহিত হয়ে মিশে যাচ্ছে বারনই নদীতে। বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত পানিতে সাদা ফেনা বয়ে যাচ্ছে। পানি থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
আবার, বারনই নদীটি রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার বাগধানী এলাকা থেকে উৎপত্তি হয়ে নাটোরের সিংড়া উপজেলার শেরকোল হয়ে আত্রাই নদীতে মিশেছে। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৩ কিলোমিটার, সর্বোচ্চ প্রস্থ ৯১ মিটার এবং গড় প্রন্থ ৫১ মিটার। এটি রাজশাহী ও নাটোর জেলার আটটি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একসময় এই নদীতে চলত লঞ্চ ও বড় নৌকা। কৃষকরা সেচের কাজে ব্যবহার করতেন নদীর পানি। এখন উজানে পানির অভাব, ড্রেজিং না হওয়া ও পৌর বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ায় নাব্যতা হারিয়ে গেছে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, নওহাটা পৌরসভা, ভবানীগঞ্জ, তাহেরপুর ও নলডাঙ্গাসহ আশপাশের এলাকার বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও কারখানার বর্জ্যসহ নগরীর পয়ঃবর্জ্য নদীতে মিশে পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এতে দেশীয় মাছ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে।
একসময় এ নদীর পানি ছিল স্থানীয় মানুষের আশীর্বাদ, জেলের জীবিকা ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রেরণার উৎস। নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল জনপদ, কৃষি ছিল সমৃদ্ধ, সংস্কৃতি ছিল জীবন্ত। কিন্তু আজ সেই বারনই হারাচ্ছে তার স্রোত, হারাচ্ছে জীবন। নদীর বুকজুড়ে চলছে দখল, গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্যে ভরাট হচ্ছে তলদেশ, দূষণে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে জলজ প্রাণ। একসময় যেখানে প্রবাহিত হতো জীবনের সুর, সেখানে আজ নীরবতা আর বর্জোর দুর্গন্ধ। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই বারনই নদী শুধু মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, হারিয়ে যাবে বাস্তবতা থেকে।
গত মাসে নওহাটা মহিলা ডিগ্রি কলেজে ‘জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বারনই নদী রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক মানববন্ধন, গম্ভিরা ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিলো। সেখানে বক্তারা দাবি করে বলেন, বারনই শুধু একটি নদী নয়; এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের জীবন, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের প্রতীক। ক্রমাগত দখল, দূষণ ও পানি সল্পতার কারণে এই নদী আজ মৃতপ্রায়। নদী রক্ষায় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বারনই এখন একটি বিষাক্ত নর্দমায় পরিণত হয়েছে। নদীর পানি শুধু অস্বাস্থ্যকর নয়, বরেন্দ্র অঞ্চলের এক সময়ের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত নদীটি এখন জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নগরীর তরল বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য ১৯৯৪ সালে দুটি খাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় রাসিক। ২০০৮ সালে খাল দুটি চালু হওয়ার পর থেকেই বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, শিল্প ও গ্যারেজের অপরিশোধিত বর্জ্য এসব খাল হয়ে রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা এলাকায় বারনই নদীতে মিশেছে।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, নদীগুলো এক সময় প্রবহমান ছিল। নৌকা চলত। বারাহী নদীতে এক পয়সা দিয়ে নৌকা পার হয়ে স্কুলে যেতাম। কিন্তু শহর বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় এসব নদী এখন খাল। খালগুলো দিয়ে শহরের সব বর্জ্য পানি বয়ে গিয়ে বারনই নদীতে মিশছে। এতে শুধু রাজশাহী নয়, বর্জ্য পানি নাটোরের চলনবিলে গিয়ে মিশে যাচ্ছে। এই এলাকার মাছ ও জলজপ্রাণীর আবাস ধ্বংস হচ্ছে।
স্থানীয় বেসরকারি সামাজিক সংগঠন ‘বাঁচার আশা সাংস্কৃতিক সংগঠন’-এর সভাপতি মোস্তফা বিজলী জানান, রাজশাহী ও নাটোরের সাত উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে চর্মরোগে ভুগছেন। নওহাটা এলাকাতেই ৮০০ জনের বেশি মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত।
শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, কৃষি খাতেও এই পানির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তবে উপায় না থাকায় কৃষকরা নদীর পানির ওপরই ভরাস করেন। কথা হয় নওহাটা এলাকার কৃষক সাইফুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নদীর পানি ক্ষতিকর জানা সত্ত্বেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে আমরা কৃষিকাজে এই পানি ব্যবহার করি।’
এদিকে দূষিত পানির কারণে নদীর জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকে এরই মধ্যে পেশা বদল করেছেন। কথা হয় ৫৫ বছর বয়সী জেলে চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একসময় এই নদীতে প্রচুর মাছ ছিল। এখন খুব একটা মাছ পাওয়া যায় না। মাছের অভাবে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করেছেন।’তিনি বলেন, পানি বিষাক্ত হওয়ায় নদীর মাছ আর খাওয়া যায় না। যতই ভালো করে মাছ রান্না করা হোক না কেন, মাছে এক ধরনের দুর্গন্ধ থেকেই যায়।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমানের মতে, ‘নদী দূষণের প্রধান উৎস হলো গৃহস্থালির পয়োনিষ্কাশন, হাসপাতাল এবং বিসিক এলাকার কারখানার তরল বর্জ্য। হাসপাতালের বর্জ্যে রোগজীবাণু থাকে, যা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এ ছাড়া বিসিক এলাকায় প্রায় ২০০টি কারখানা থাকলেও কোনোটির বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। ফলে শিল্প বর্জ্য সরাসরি নদীতে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের সহযোগিতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বারনই নদীর পানি এখন জৈবিকভাবে মৃত। গবেষণায় বলা হয়, জলজ জীবনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা ন্যূনতম ৪.৫ মিলিগ্রাম থাকা দরকার। কিন্তু দক্ষিণ নওদাপাড়া এলাকায় সংগৃহীত নমুনায় এই মাত্রা পাওয়া গেছে মাত্র ১.২ মিলিগ্রাম। এ ছাড়া পানিতে পরিবাহিতা (কনডাক্টিভিটি) ও ক্ষারত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি যা অতিরিক্ত রাসায়নিক দূষণ নির্দেশ করে। একই গবেষণায় খালসংলগ্ন জমির মাটিতে সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও জিংকের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।
অধ্যাপক মিজানুর বলেন, ‘এই ধাতুগুলো মাটি থেকে ফসলে যায়, পরে খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার ও অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়ক তন্ময় কুমার সান্যাল বলেন, ‘আইনে শিল্প ও পৌর বর্জ্যকে বিপজ্জনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এগুলো পরিশোধনের আগে অপসারণ করা নিষিদ্ধ। তবুও পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
দখল-দূষণের বিষয়ে জানতে চাইলে রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন মানবকণ্ঠকে বলেন, এটা শুধু রাজশাহী নয়, সারাদেশের চিত্র। এ জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসাতে হবে। এটা কবে নাগাদ বসানো সম্ভব, তা আমার জানা নেই।’তবে ‘আমরা কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছি।’
রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ মাহমুদ বলেন, একটি কেন্দ্রীয় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) জমা দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ‘শহরের বর্জ্য পানি শোধনের জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসানোর একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলেই কাজ শুরু হবে।’
তবে কবে নাগাদ এগুলো বাস্তবায়ন হবে তা কেউই জানাতে পারেননি।


