
ইসলামে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন যোগ্য মানুষের হাতে দেশ পরিচালনার জন্য যোগ্যপ্রার্থী নির্বাচন করা একজন মুসলমানের দায়িত্ব।

পবিত্র কুরআনে সূরা নিসার ৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
مَنۡ یَّشۡفَعۡ شَفَاعَۃً حَسَنَۃً یَّکُنۡ لَّہٗ نَصِیۡبٌ مِّنۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّشۡفَعۡ شَفَاعَۃً سَیِّئَۃً یَّکُنۡ لَّہٗ کِفۡلٌ مِّنۡہَا ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ
مُّقِیۡتًا
অর্থ- যে ব্যক্তি কোন ভালো কাজে সুপারিশ করে, তার তাতে অংশ থাকে, আর যে ব্যক্তি কোন মন্দ কাজে সুপারিশ করে, তারও তাতে অংশ থাকে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে নজর রাখেন।
অর্থাৎ ভোটে অংশগ্রহণ করে একজন সঠিক মানুষের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়াও একজন মুসলমানের দায়িত্ব।
এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে অযোগ্য কাউকে নির্বাচিত করলে তার মাধ্যমে সমাজে যত অরাজকতা সৃষ্টি হবে এর কারণে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহিতা করতে হবে ভোটার বা নেতা নির্বাচনকারীকে।
*সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণেই সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর কাফন-দাফনের চেয়ে রাষ্ট্রের নেতা নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে খলিফা নির্বাচিত করেছিলেন।*
নেতা নির্বাচনে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হওয়ার তাগিদ দেয় ইসলাম। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট একটি পবিত্র আমানত। এ আমানত ওই ব্যক্তির কাছেই গচ্ছিত রাখতে হবে; যিনি শিক্ষিত, সৎ, যোগ্য, ন্যায়পরায়ণ, নিরপেক্ষ এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার কল্যাণে কাজ করেছেন, করছেন ও করবেন।
এ ছাড়া যিনি তার অন্তরে জবাবদিহির ভয় পোষণ করেন, তাকে ভোটদান করলে সমাজের কল্যাণকর কাজ হবে।
পক্ষান্তরে অসৎ, অযোগ্য, পক্ষপাতদুষ্ট, অশিক্ষিত, সমাজবিরোধী ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে তার দ্বারা সমাজের ধ্বংসাত্মক ছাড়া আর কোনো কাজ করা সম্ভব হয় না।
*ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট হচ্ছে তিনটি বিষয়ের সমষ্টি*
(১) সাক্ষ্য প্রদান করা
(২) সুপারিশ করা
(৩) প্রতিনিধির ক্ষমতা প্রদান করা।
*(১) সাক্ষ্য দেওয়া*
প্রতিনিধি বা নেতা যাকে ভোট প্রদান করলাম তাকে সাক্ষ্য প্রদান করলাম যে, তিনি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক দায়িত্ব পালনে আস্থাশীল একজন সৎ, যোগ্যপ্রার্থী। যদি আমরা কোনো প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে অযোগ্য, অসৎ বা মন্দ লোককে ভোট প্রদান করি, তবে তার অর্থ দাঁড়ায় আমি মিথ্যে সাক্ষ্য প্রদান করলাম; যা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বড় অপরাধ ও গোনাহের কাজ।
এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনুল কারীমে উল্লেখ রয়েছে, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদানে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যদি তা তোমাদের নিজেদের কিংবা পিতা-মাতা অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। যদি সে বিত্তশালী হয় কিংবা দরিদ্র হয়। তবে আল্লাহ উভয়ের ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা (প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে) এড়িয়ে যাও, তবে জেনে রেখো তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত’। (সূরা:
নিসা, আয়াত-১৩৫)।
*(২) সুপারিশ করা*
কোনো ব্যক্তি কোনো প্রার্থীকে ভোট প্রদানের অর্থ হলো, সে ব্যক্তি ওই প্রার্থীকে একজন সৎ, যোগ্য প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করার সুপারিশ করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, সুপারিশ দুনিয়া ও পরকালে ব্যক্তির ভালো-মন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সুরা নিসার ৮৫ নং আয়াতে ও আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন একথাই বলেছেন।
*(৩) প্রতিনিধির ক্ষমতা প্রদান করা*
ক্ষমতা প্রদান হলো ভোট প্রদানে ইসলামের তৃতীয় মূলনীতি। জেনে-শুনে-বুঝে কোনো অসৎ ও অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট প্রদান করার পুরো দায়ভার যিনি ভোট প্রদান করবেন তাকেই বহন করতে হবে।
এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন*, ‘নিশ্চয় আমি আসমানসমূহ, জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এ (মানুষের জীবন পরিচালনায় ইসলামের বিধিবিধান পালনের) আমানত পেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা তাতে আশঙ্কিত হলো, কিন্তু মানুষ সে দায়িত্বভার গ্রহণ করল। সে বড়ই অন্যায়কারী, বড়ই অজ্ঞ’। (সূরা: আহযাব, আয়াত-৭২)।
*নির্বাচনের মাধ্যমে জনসেবা*
ইসলাম একটি সামাজিক ও মানবিক ধর্ম। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই একটি ইবাদত। এর মাধ্যমে দেশ, ধর্ম ও মানবতার সেবা করার বিরাট সুযোগ লাভ করা যায়। যারা প্রার্থী হবে তারা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশায় মানবতার সেবার নিয়তে প্রার্থী হন এবং আমানতদারীর সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে আল্লাহকে ভয় করে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা শুধু দুনিয়ায় সম্মানিত হবেন না, বরং আল্লাহর কাছেও বড় মর্যাদার অধিকারী হবেন।
*হাদীসের আলোকে সৎ প্রার্থীর মর্যাদা*
*এক* রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যারা মানবসেবায় নিয়োজিত থাকবে, তাদের মর্যাদা হবে সে লোকের মতো যে সারারাত ইবাদত করে এবং সারাদিন রোজা রাখে। ’
*অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন*,
‘প্রত্যেক কাজের সফলতা, ব্যর্থতা, সুফল ও কুফল ব্যক্তির নিয়তের ওপর নির্ভর করে। (বুখারি-মুসলিম)
প্রার্থী যদি নির্বাচিত হয়ে দেশ, ধর্ম ও মানুষের জন্য কল্যাণকর এবং সওয়াবের কাজ করেন, তখনই শুধু তিনি সে সম্মান ও মর্যাদা পাবেন। যারা ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করবেন তারাও অনুরূপ সওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হবেন।
*হাদীস নং৩.*
ভোটারদের কারণেই তিনি এমন পুণ্যময় কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যারা ভালো বা মন্দ কাজ করে বা করার ক্ষমতা ও সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় তারা ওই কর্ম সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব বা গুনাহ অর্জন করবে। ’ (তিরমিজি-মিশকাত)
নির্বাচিত ব্যক্তি যদি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে মানবতাবিরোধী এবং ইসলামবিরোধী ও নির্যাতনমূলক কাজ করেন, তাহলে তাকে শুধু নয় যারা তাকে নির্বাচিত করবেন এবং ভোট দেবেন সবাইকে এসব অপকর্মের দুর্ভোগ পোহাতে হবে এবং কঠিন আজাবের সম্মুখিন হতে হবে। যেহেতু তাদের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার ফলেই এতসব অপকর্ম করার সুযোগ ওই মন্দ লোকটি পেয়েছে।
অতএব, প্রতিটি নির্বাচনে সৎ ও যোগ্যপ্রার্থীকে ভোট প্রদান আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। কোনো প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে বা অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ও অসৎ লোককে ভোট প্রদান একটি গোনাহের কাজ। অতএব, ভোটাধিকার প্রদানের ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে সচেতন থাকা অত্যাবশ্যক।
ছাত্ররাই হলো দেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারি।যাদের কাছে আমাদের পরবর্তী তরুণ প্রজন্মের ইমান,আকিদাহ, চরিত্র -আখলাক নিরাপদ থাকবে।
তাই সঠিক এবং যোগ্য নেতৃত্বের হাতে দ্বায়িত্ব অর্পণ করা এখন সময়ের দাবি এবং সবচেয়ে বড় আমানত।
আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে এই ঈমানী দ্বায়িত্ব পালন করে ,সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার তৌফিক দান করুন আমীন।
সুলতানা আক্তার মহুয়া


