
৩২ ফুট গভীর কম্পো নদী পারাপারে ছোট নৌকা-ভেলা, ঝুঁকিতে কোমলমতি শিশুরা ! ৫ মাস ধরে স্কুলে যেতে পারছে না অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।
রাকিবুল ইসলাম, মোহনপুর( রাজশাহী)প্রতিনিধি : সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৩২ ফুট গভীর কম্পো নদী। নদীর এক পাড়ে বিদ্যালয়, অন্য পাড়ে শিক্ষার্থীদের বাড়িঘর। বিদ্যালয়ে যেতে প্রতিদিন ছোট ডিঙি নৌকায় নদী পার হতে হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। বর্ষায় নদীতে পানি ও স্রোত বাড়লে সেই পারাপার হয়ে ওঠে আরও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে ব্যবহৃত নৌকাটিও ভেঙে যাওয়ায় প্রায় পাঁচ মাস ধরে নদীর ওপারের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। কেউ কলাগাছের ভেলায়, আবার কেউ সাঁতরে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভার কম্পো নদীর কোলঘেঁষে অবস্থিত নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির বয়স প্রায় ১২১ বছর। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নদীর ওপর নিরাপদ কোনো স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ নৌকা। নৌকা ব্যবহার না করলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের প্রায় চার কিলোমিটার ঘুরে বিদ্যালয় ও নিজ নিজ গন্তব্যে যেতে হয়। বর্ষাকালে সেই পথ কাদায় পরিণত হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়েই বছরের অধিকাংশ সময় ছোট নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়।
স্থানীয়দের চলাচলের কথা বিবেচনা করে মোহনপুর উপজেলা এলজিইডির উদ্যোগে এডিপির অর্থায়নে নদীর ওপর অর্ধেক অংশে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে বর্ষায় নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সাঁকোটির অচল অবস্থা।
ফলে সেটিও এখন ব্যবহার অনুপযোগী।
স্থানীয়রা জানান, নদীর গভীরতা প্রায় ৩২ ফুট হওয়ায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারাপারের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছোট শিশুদের নৌকায় ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
পাঁচ মাস ধরে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না শিক্ষার্থীরা


মালিদহ গ্রামের অভিভাবকরা জানান, নদীর পানি বৃদ্ধি ও নৌকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে গ্রামের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থী দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। কেউ কলাগাছের ভেলা বানিয়ে নদী পার হওয়ার চেষ্টা করছে, আবার কেউ বাধ্য হয়ে সাঁতার কেটে নদী পার হচ্ছে।
একজন অভিভাবক আছিয়া খাতুন বলেন, “আমার সন্তানরা পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহী। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। কয়েকবার নদী পার হতে গিয়ে তারা বিপদের মুখে পড়েছে। কেউ কেউ সাঁতার কেটেও ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারছে না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। সরকারের কাছে দ্রুত একটি নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করার দাবি জানাই।
যোগাযোগ সংকটে শিক্ষার্থী কমেছে অর্ধেক
স্থানীয়দের দাবি, একসময় নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। কিন্তু দীর্ঘদিনের ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা ও নদী পারাপারের সমস্যার কারণে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে প্রায় ১৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। নদীর ওপারের মালিদহ ও গোপাইল গ্রামের শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, ছোট শিশুদের প্রতিদিন নৌকায় করে নদী পার করে বিদ্যালয়ে পাঠানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতেও ভয় পান।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর জানায়, নদীতে পানি ও স্রোত বাড়লে নৌকায় পার হওয়ার সময় তাদের ভয় লাগে। নৌকায় ওঠা-নামার সময় অনেক সময় ভারসাম্য হারিয়ে বই-খাতা পানিতে পড়ে যায়। নৌকাটি বর্তমানে ভেঙে যাওয়ায় তাদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা বেগম বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই মালিদহ গ্রামের। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ায় ঝুঁকি তৈরি হয়। কম্পো নদীটি অনেক গভীর। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেন এবং তাদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার বিষয়ে আমরা সবসময় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
মোহনপুর উপজেলা প্রকৌশলী জানান, কেশরহাট পৌরসভার মালিদহ ও নওগাঁ গ্রামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য কম্পো নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব উপজেলা থেকে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়েছে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “স্থানীয়দের চলাচলের সুবিধার কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের সাময়িক চলাচলের জন্য এডিপির অর্থায়নে উপজেলা এলজিইডির মাধ্যমে অর্ধেক অংশে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্ষায় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় সাঁকোর বাকি অর্ধেক না থাকায় বর্তমান অচলাবস্থা হয়ে আছে। নদীটির গভীরতা প্রায় ৩২ ফুট। স্থায়ী সমাধানের জন্য সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
কেশরহাট পৌরসভার প্রশাসক ও মোহনপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এখানে এ ধরনের সমস্যা ও চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। গত বছর জুন মাসে চলাচলের জন্য একটি বড় নৌকা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেটি ভেঙে গেছে। নতুন করে আরেকটি নৌকার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। স্থানীয়রা যদি নিজেদের উদ্যোগে সাঁকো নির্মাণের উদ্যোগ নেন, তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
নওগাঁ, মালিদহ ও গোপাইল গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, কম্পো নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হলে শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, তিন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াত সহজ ও নিরাপদ হবে। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগও দূর হবে।
স্থানীয়রা বলেন, স্থায়ী সেতু নির্মাণে সময় লাগলেও শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরাপদ সাঁকো অথবা নৌকার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের জীবনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।


