
রাবিতে ‘বাকশাল’ জবাই: রাকসুর নাম ব্যবহার নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে একটি গরুর নাম ‘বাকশাল’ রেখে সেটি জবাই করে ‘জুলাই জিয়াফত’ আয়োজনের ঘটনায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ ভোজ অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজনটি ঘিরে শুরুতে রাকসুর নামে প্রচারণা চালানো হলেও পরে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে রাকসুর নাম ব্যবহার করে এমন আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শিক্ষার্থীরা।
এর আগে শুক্রবার রাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘১৫ আগস্ট আপনাদের সবাইকে নিয়ে আমাদের যে প্রাণপ্রিয় গরুটা আনতে পারছি, তার নাম দেওয়া হয়েছে বাকশাল। এই বাকশালটাকে আমরা কোরবানি করে উদযাপন করব। এটাকে জুলাই জিয়াফতও বলতে পারেন, জুলাইয়ের আপ্যায়ন। আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ থাকবে।’
পরে মধ্যরাতে দেওয়া আরেক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘১৫ আগস্ট রাতেই বাকশালরে শুয়াইয়া দিলাম। আমি মেজর সালাহউদ্দিন আম্মার বলছি।’ ওই পোস্টে আওয়ামী লীগকে নিয়ে অশালীন ভাষাও ব্যবহার করা হয়।
জানা গেছে, আয়োজনে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের গুগল ফর্মের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়। নিবন্ধন বাবদ নেওয়া হয় ১৫ টাকা। আম্মারের দাবি, সব মিলিয়ে প্রায় ৭৫০ শিক্ষার্থী এতে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬৫০ জনের জন্য গরুর মাংসের খাবার এবং বাকি ১০০ জনের জন্য বিকল্প খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
শুরুতে রাকসুর পক্ষ থেকে আয়োজনটি করা হচ্ছে—এমন প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
শিক্ষার্থী কৌশিক দাশ কংকন এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলে লেখেন, সালাহউদ্দিন আম্মার ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের টাকা দিয়ে রাকসুর নাম ব্যবহার করে গরু কুরবানি করছে। ছেলেমেয়েদের টাকা এভাবে নষ্ট করার এখতিয়ার তাকে কে দিল।
নিশা আক্তার নামের আরেক শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন, অথচ হলের খাবারের মান আগের মতোই আছে। ইন্টারনেটের বেহাল দশা। আবাসিক সমস্যার নেই কোনো সমাধান। এই হলো আমাদের ৩৫ বছর পর পাওয়া রাকসুর কর্মকাণ্ড।
এদিকে আয়োজনটির রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল।
তিনি বলেন, আগস্টকে কেন্দ্র করে এ ধরনের আয়োজন সস্তা রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আয়োজনটি শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম রাকসুর ব্যানারে করা হচ্ছে। রাকসুর নেতৃবৃন্দের এমন দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে যে, এটি তাদের উদ্যোগে হচ্ছে। তাহলে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে এ ধরনের আয়োজন কেন—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ফুয়াদ রাতুল আরও বলেন, যদি এটি সালাহউদ্দিন আম্মারের ব্যক্তিগত উদ্যোগও হয়ে থাকে, তাহলেও প্রশ্ন আসে, ছাত্রশিবির কেন নিজেদের ব্যানারে আয়োজনটি করছে না। শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্মের আড়ালে রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
তবে আয়োজনের অর্থায়ন ও রাকসুর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি বলেন, এটি ব্যক্তিগত আয়োজন নয়। দেশের বাইরে থাকা একজন ভাই জুলাইয়ের খুশিতে একটি গরু উপহার দিয়েছেন। সেটি দিয়েই এ আয়োজন করা হয়েছে। শুরুতে রাকসুর পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হয়েছিল। তবে রাকসুর সব সদস্য এতে একমত হয়নি। পরে আমাদের এক ভাই এটি উপহার দিয়েছেন। এখানে রাকসু জড়িত নয়।
কে ওই গরু উপহার দিয়েছেন—জানতে চাইলে আম্মার বলেন, এমন অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন, যারা উপহার বা সহযোগিতা করার জন্য নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। তাই সংগত কারণেই আমি সেই ভাইয়ের পরিচয় জানাতে পারছি না।
আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাকসুর জিএস বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি ও বাকশাল পতনের এই গুরুত্বপূর্ণ দিনটিকে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাই। মুজিবের ভালো কাজকে ভালো এবং খারাপকে খারাপ বলতে শিখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ করেছে বলেই ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের সব কর্মকাণ্ড ক্ষমাযোগ্য হয়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়।
রাকসুর মতো শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বশীল একটি প্ল্যাটফর্মের নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচি আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। আয়োজনটি ব্যক্তিগত, নাকি রাকসুর আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ—এ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।


