
রাতভর চলে ব্যাটারি চার্জ, বাড়ছে বিদ্যুতের ‘গোপন লোড’ও রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি
রাজশাহীতে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করেই চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও চার্জার রিকশার বাণিজ্যিক চার্জিং। কোথাও বাড়ির মিটারে, কোথাও দোকানের সংযোগে, আবার কোথাও বৈধ সংযোগের বাইরে সরাসরি বিদ্যুৎ নিয়ে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে ব্যাটারি। প্রতি গাড়ি থেকে দৈনিক ১৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও সেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশই যাচ্ছে আবাসিক কিংবা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বাড়ছে হিডেন লোড, অন্যদিকে সরকার ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) স্টেশন বাজার ও স্টেডিয়াম মার্কেট ঘুরেও এমন অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দিয়ে সকালে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান চালকরা। মাসে অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন এভাবে চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুধু রাবি নয়, নগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও গ্যারেজেও একইভাবে চলছে চার্জিংয়ের অভিযোগ।
দিনাজপুর থেকে রাজশাহীতে রিকশা চালাতে আসা মুন্না (৪৫) ভদ্রা থেকে অলকার মোড়ে যাওয়ার পথে বলেন, ‘কাউকে বইলেন না আমার নাম।’তাঁর ভাষ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারে কম টাকায় মাঝে মাঝে অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হয়। অনেক আবাসিক বাড়ির পাশের দোকানের মিটারেও ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়।
রাবিতে অভিযোগ, নজরদারিতে ১৯০ মিটার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়াম মার্কেটে প্রায় ৭৪টি দোকান রয়েছে। এসব দোকানের বেশিরভাগই ফটোকপি, কম্পিউটার, কোচিং ও প্রাইভেট সেন্টার। স্টেশন বাজারে রয়েছে প্রায় ৫৭টি দোকান—মুদি, ফার্মেসি, লন্ড্রি, চা-সিগারেট ও খাবারের দোকানসহ নানা ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকার কিছু দোকানে বৈধ ব্যবহারের বাইরে লন্ড্রি, সেলুন ও অটোরিকশা চার্জিংয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার প্রবণতা বেশি।
এ ঘটনায় রাবির ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার বাইতুল্লাহর বিরুদ্ধে মিটার রিডিং না নিয়ে বিল তৈরি এবং অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে অর্থ ভাগ-বাটোয়ারার একটি সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রাবির ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার বাইতুল্লাহ কালবেলাকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই অংশে মিটার রিডিং নেওয়া হয়। এর একটি অংশে তাঁর দায়িত্ব রয়েছে। তাঁর আওতায় প্রায় ১৯০টি মিটার রয়েছে। অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি দোকানে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে গিয়ে দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
রাবির জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক এস এম কামরুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, প্রশাসনিকভাবে কোনো অনিয়মকে ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিবন্ধিত ১৪,৭৮৯, রাস্তায় ২৬-২৮ হাজার
রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) সূত্রে জানা যায়, নগরীতে অনুমোদিত বড় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে ৮ হাজার ৯৭০টি। ছোট অটোরিকশা ৫ হাজার ৮১৯টি। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত অটোরিকশা ১৪ হাজার ৭৮৯টি। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। রাসিক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন নগরীর সড়কে চলাচল করে প্রায় ২৬ হাজার থেকে ২৮ হাজার অটোরিকশা। এর মধ্যে আড়াই থেকে তিন হাজার আসে আশপাশের এলাকা থেকে। অর্থাৎ নগরীর নিজস্ব অটোরিকশার সংখ্যাও প্রায় ২১ থেকে ২২ হাজার।
অর্থাৎ নিবন্ধিত সংখ্যার তুলনায় বাস্তবে রাস্তায় চলাচলকারী অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেশি। এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্যই গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, নগরীতে প্রায় সাড়ে ৫০০ অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই কাঁচা বা টিনের ছাউনির। অনেক গ্যারেজে অগ্নিনিরাপত্তা কিংবা নিরাপদ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কোনো ব্যবস্থা নেই। সরাসরি মেইন লাইন বা আবাসিক সংযোগ থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গাড়ি বাড়ছে, বাড়ছে বিদ্যুতের ‘হিডেন লোড’
বিদ্যুৎ প্রকৌশলীদের মতে, একটি সাধারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা ইজিবাইকে ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। পূর্ণ চার্জে গড়ে ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে। গাড়ির ব্যাটারি ও চার্জারের ধরনভেদে একবার পূর্ণ চার্জে প্রায় ৬ থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। সময় লাগে প্রায় ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, কিছু অটোরিকশায় তিন থেকে চারটি ব্যাটারি থাকে, সেগুলো পূর্ণ চার্জ হতে প্রায় ৭ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। আবার চার থেকে ছয়টি ব্যাটারির গাড়িতে প্রায় ১০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, কয়েকশ অটোরিকশা একসঙ্গে চার্জে দিয়ে চালকরা রাতভর ঘুমান। এতে একই সময়ে গ্রিডের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ে। এর প্রভাব লোডশেডিংসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তিতে পড়তে পারে।
বছরে চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি!
সারা দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যা আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ। রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি চার্জিং পয়েন্ট। নিয়ন্ত্রণহীন এই বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের দ্রুত বিস্তার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সিপিডির গবেষণা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জে জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত চার্জিংয়ের কারণে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত চাপ, ভোল্টেজ ড্রপ, সিস্টেম লস এবং লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে।
তবে অটোরিকশা চার্জিংয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি বক্তব্যে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব রয়েছে। সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে এবং এসব যানবাহনের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ চাহিদা মোট উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে।
চার্জিং ব্যবসা, কিন্তু মিটার আবাসিক!
রাজশাহীর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই—যে বিদ্যুৎ দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে অটোরিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে, তার সংযোগের ধরন কী? অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক মিটারের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে দিনের পর দিন বাণিজ্যিক চার্জিং ব্যবসা চালানো হচ্ছে। ফলে একজন সাধারণ আবাসিক গ্রাহকের নামে নেওয়া সংযোগ থেকে আয় করছেন অন্য কেউ। অথচ ওই সংযোগে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, তার প্রকৃত বাণিজ্যিক মূল্যও আদায় হচ্ছে না।
রাসিকের রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাইদ কালবেলাকে বলেন, নগরীতে মোট কতটি অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা তাদের জানা নেই। মাঝে মাঝে গ্যারেজে গিয়ে স্টিকার দেওয়া হয়। অবৈধভাবে অটোরিকশায় চার্জ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আগে হতো, এখন নেই বললেই চলে। তবে কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) জিয়াউল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে অটোরিকশা বা চার্জার রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। এ ধরনের অবৈধ সংযোগ ও বিদ্যুতের অপব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সংযোগের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জরিমানাও করা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণে আসছে অটোরিকশা
অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঠেকাতে সরকারও নতুন ব্যবস্থাপনার পথে হাঁটছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এক মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, কিউআর কোড ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহীতেও লাইসেন্সবিহীন ও নিয়মভঙ্গকারী অটোরিকশার বিরুদ্ধে রাসিক ও রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) অভিযান চালাচ্ছে। নগরীর জিরো পয়েন্ট, রেলগেট, তালাইমারী ও ভদ্রাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চলছে নজরদারি।
কিন্তু অটোরিকশার নিবন্ধন ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চার্জিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে না আনলে সমস্যার বড় অংশই থেকে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সড়কে একটি অটোরিকশার বৈধতা যাচাই করা গেলেও কোন মিটারের বিদ্যুৎ দিয়ে তার ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে—সেই হিসাবই এখন সবচেয়ে বড় অন্ধকারে।
আর এই অন্ধকারেই আবাসিক বিদ্যুৎ হয়ে উঠছে বাণিজ্যিক চার্জিংয়ের হাতিয়ার; বাড়ছে বিদ্যুতের অপচয়, সিস্টেম লস ও রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি।


