
নিরাপত্তা-গোপনীয়তা, কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয়দের দাবি; নৌযাত্রায় লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিতের নির্দেশ
পদ্মার বুকে জেগে ওঠা চর, চারদিকে নদীর জল আর বিস্তীর্ণ সবুজ—প্রকৃতির টানে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিডলচরে এখন প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিওতে পরিচিত হয়ে ওঠা এই চর অল্প সময়েই পরিণত হয়েছে নগর ও আশপাশের মানুষের আকর্ষণীয় ভ্রমণস্থলে। কিন্তু পর্যটকের এই ঢল স্থানীয়দের জন্য সৌন্দর্যের পাশাপাশি বয়ে এনেছে উদ্বেগও। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ড্রোনের অবাধ ব্যবহার, কৃষিজমি-গবাদিপশুর ক্ষতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নৌযাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়রা বলছেন, এখনই পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটনস্থলই স্থানীয়দের ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ছুটির দিনসহ বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী মিডলচরে আসছেন। অপরিচিত মানুষের অবাধ চলাচলে স্থানীয় নারী ও শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় দর্শনার্থীদের কেউ কেউ স্থানীয়দের বাড়ির ভেতরেও প্রবেশ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবারগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ড্রোন ক্যামেরার ব্যবহার। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ আকাশে ড্রোন উড়িয়ে চর ও আশপাশের এলাকার ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ড্রোন অনেক সময় বাড়িঘর ও ব্যক্তিগত পরিসরের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। বিশেষ করে নারীরা নদীতে গোসলের সময় কিংবা ছাদবিহীন টয়লেট ব্যবহারের সময় ড্রোনের উপস্থিতিতে বিব্রত ও অস্বস্তিতে পড়ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন (৭৫) বলেন, ‘আমরা চাই মানুষ ঘুরতে আসুক। আমাদের এলাকার সৌন্দর্য সবাই দেখুক। কিন্তু আমাদের পরিবার ও মা-বোনদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও দেখতে হবে। ড্রোন দিয়ে বাড়িঘর ও মানুষের ছবি ধারণ করা হলে আমরা অস্বস্তিতে পড়ি।’
স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম নেছা (৪৫) বলেন, ‘আমরা যখন গোসল করি, তখন আমাদের মাথার ওপরে কোনো ছাদ থাকে না। কখন কী অবস্থায় আমাদের পোশাক থাকে, সেটাও ঠিক থাকে না। ওই সময় ড্রোনের মাধ্যমে ছবি তুলে নেওয়া হলে আমরা খুব অস্বস্তি বোধ করি। প্রশাসনের সহযোগিতা চাই, যাতে এসব নিয়ন্ত্রণে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘুরতে আসা সবাই ভালো নয়। কেউ কেউ পাশেই টিউবওয়েল থাকার পরও আমাদের বাড়িতে এসে পানি খেতে চান। এতে ঘরের জিনিসপত্র নিয়েও আমরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকি।’
দর্শনার্থীদের বাড়তি চাপের প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষিতেও। স্থানীয় বাসিন্দা লালন আহমেদ বলেন, ‘আমরা এখানে বছরে একবার কালাই ফসল বুনে থাকি। এখন বেশি মানুষের যাতায়াতের কারণে খুব বিড়ম্বনায় পড়েছি। এভাবে মানুষ চলাচল করলে এ বছর ফসল করতে পারব কি না, তা নিয়েই চিন্তায় আছি।’

গবাদিপশু পালনকারীরাও পড়েছেন সমস্যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘আমাদের একমাত্র জীবিকার প্রধান মাধ্যম গরু ও ভেড়া পালন। অথচ লোকসমাগম বেশি হওয়ার কারণে চরের ঘাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দর্শনার্থীরা গরুর সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে গরুকে বিরক্ত করেন, তাড়িয়ে বেড়ান। এতে গরু-ভেড়া ঠিকমতো ঘাস খেতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দর্শনার্থীরা চিপসের প্যাকেট, বাদামের খোসা ও পলিথিন যত্রতত্র ফেলে যাওয়ায় পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।’
স্থানীয় মিডলচরের সরদার লুৎফর রহমান বলেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। পর্যটকরা যেন আনন্দ করতে এসে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি না করেন, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার।
স্থানীয়দের এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও সতর্কতার কথা জানানো হয়েছে। রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ও মুখপাত্র সাবিনা ইয়াসমিন মানবকণ্ঠকে বলেন, মিডলচরে দর্শনার্থীদের যাতায়াত বাড়লেও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। অনুমতি ছাড়া কারও বাড়িতে প্রবেশ, হয়রানি কিংবা ড্রোনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিসরে ছবি ধারণের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দর্শনার্থীদেরও স্থানীয়দের প্রতি সম্মান ও দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে চরটিতে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম নৌকা হওয়ায় নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও সতর্ক রয়েছে পুলিশ। রাজশাহী অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন মানবকণ্ঠকে বলেন, পদ্মা নদীতে এখন ভরা মৌসুম। তাই যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে। অনেক যাত্রী লাইফ জ্যাকেট নিতে চান না। তবে তাদের সচেতন করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নৌকার মাঝিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাত্রীরা যেন লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করেন। লাইফ জ্যাকেট ছাড়া কোনো নৌকা না ছাড়ার বিষয়েও বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। পর্যটনের বিষয়টি পুলিশের মূল দায়িত্বের মধ্যে না পড়লেও সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।
পরিবেশের ওপরও দর্শনার্থীর চাপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পরিবেশ অধিদপ্তর। রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, মিডলচরের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় দর্শনার্থীদের আরও সচেতন হতে হবে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহার ও কৃষিজমির ক্ষতি থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন গড়ে তুলতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে দর্শনার্থীদের মধ্য থেকেও স্থানীয়দের সমস্যার বিষয়টি উঠে এসেছে। দর্শনার্থী মুমিনুল ইসলাম (২৮) বলেন, ‘আমরা এখানে ঘুরতে এসে দেখলাম, স্থানীয় বাসিন্দারা অনেকটাই বিরক্ত। বিভিন্ন অজুহাতে অনেক দর্শনার্থী তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ছেন। আবার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মেয়ে দর্শনার্থী জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয়দের টয়লেট ব্যবহার করছেন। ঠিক ওই সময় কিছু তরুণ ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে বিভিন্নভাবে ছবি তোলার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।’
স্থানীয়দের মতে, পদ্মার বুকে জেগে ওঠা মিডলচরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রেখে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে এলাকার মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন সেই সম্ভাবনাকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পরিবেশের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।

তাই স্থানীয়রা এখনই দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মনীতি প্রণয়ন, ড্রোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, নৌযাত্রায় লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক, কৃষিজমি ও গবাদিপশু রক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভিড়ের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজরদারির আওতায় আনারও দাবি তাদের।
মিডলচরকে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও জীবিকা এবং চরের প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিলে মিডলচর হবে এমন এক পর্যটনস্থল, যেখানে দর্শনার্থীর আনন্দের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্বস্তি ও নিরাপত্তারও সমান গুরুত্ব থাকবে।


