
শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিতে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। দাবি আদায়ের আন্দোলনে পাঁচ দিনের বিরতীর পর সর্বশেষ টানা দুই দিনের আন্দোলনে ফের বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে গেছে।মঙ্গলবার (১২ মে) সকাল থেকেও ক্যাম্পাসে অচলাবস্থা অব্যাহত ছিল। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

এর আগে, আন্দোলনরত শিক্ষকরা সোমবার প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দপ্তর থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন। ফলে সব দপ্তরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। যদিও শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন, তবে কোনো বিভাগে ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০ জন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, ছয় মাস আগে পদোন্নতি বোর্ড গঠন করা হলেও একাধিক সিন্ডিকেট সভায় বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছেন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম। এর প্রতিবাদে সোমবার তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষকরা।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে আজ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ৬০ জন শিক্ষক পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও তার এখনো কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল কাইউম বলেন, প্রক্টরসহ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সিন্ডিকেটের নয়জন শিক্ষক দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ছাড়া, আরও অন্তত ৪০ জন শিক্ষক পদত্যাগ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানতে পেরেছি।
প্রক্টরের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক রাহাত হোসাইন বলেন, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতি নিয়ে উপাচার্যের দীর্ঘসূত্রতায় তার সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। তাই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।প্রশাসনিক দপ্তরে তালা থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কার্যত কর্মহীন সময় পার করছেন। অর্থ দপ্তরের প্রধান সুব্রত কুমার বাহাদুর বলেন, শিক্ষকদের অনুরোধে আমরা কক্ষ ছেড়েছি। উপাচার্য নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়েই অবস্থান করব।
আন্দোলনরত শিক্ষকরা জানান, গত ৩০ এপ্রিল পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে উপাচার্য, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার এবং শিক্ষকদের প্রতিনিধিদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়।সেখানে বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ওই বৈঠকের পর শিক্ষকরা পাঁচ দিনের জন্য শুধু পাঠদানে ফেরেন। তবে গত ৮ মে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকা হলেও সেখানে সংকট সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, বরং অধিকাংশ সিন্ডিকেট সদস্যের মতামত উপেক্ষা করে উপাচার্য একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন।
উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিক আলম আন্দোলনকে আইনবিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেন, শিক্ষকরা চাইলে কর্মবিরতি পালন করতে পারেন, কিন্তু অন্যের কাজে বাধা দিতে পারেন না। প্রশাসনিক দপ্তরে তালা দেওয়া সরাসরি আইনবিরোধী।তিনি আরও বলেন, সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষকদের পাঁচজন প্রতিনিধিসহ সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে আগামী দুই মাসের মধ্যে অভিন্ন সংবিধি প্রণয়ন করে পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা বিধি অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে আন্তরিক।
পদত্যাগের বিষয়ে উপাচার্য মুঠোফোনে বলেন, এখন পর্যন্ত আমার কাছে কোনো লিখিত পদত্যাগপত্র আসেনি। কয়েকজন মৌখিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির কথা জানিয়েছেন।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, শুরুতে ২০১৫ সালের বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে পরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০২১ সালের অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণের পরামর্শ দিলে প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়। দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই নীতিমালা কার্যকর হলেও বরিশালসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে নতুন সংবিধি অনুমোদনের পর পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গত ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন ধাপে ধাপে কর্মবিরতি, শাটডাউন ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচিতে রূপ নেয়। বর্তমানে চলমান অচলাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশাসনিক সেবা ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।


