
১০০ গাড়ি আটকের সক্ষমতা, জায়গা মাত্র ২০টির; পার্কিং সংকটে সড়ক দখল, বাড়ছে যানজট-দুর্ভোগ
আইন ভাঙছে যানবাহন। লাইসেন্স নেই, ফিটনেস নেই, রুট পারমিট নেই—তারপরও চলছে সড়কে। রাজশাহী মহানগরীতে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। মামলা, জরিমানা এমনকি যানবাহন আটকেরও সক্ষমতা রয়েছে পুলিশের। কিন্তু আটকের পরই দেখা দিচ্ছে বড় সংকট—গাড়ি রাখবে কোথায়?
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগের জন্য নেই কোনো স্থায়ী, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্টেশন। ফলে সড়কে আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও জায়গার সংকটে অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি জব্দ করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। মামলা-জরিমানা করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এরপর কিছুক্ষণ পর কিংবা পরদিনই সেই যানবাহন আবারও নামছে সড়কে।
ট্রাফিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, বর্তমানে তাদের যে পরিমাণ গাড়ি রাখার সুযোগ রয়েছে, তার তুলনায় প্রয়োজন অনেক বেশি। একজন কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১০০টি গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হলেও যদি ২০টি গাড়ি রাখার মতো জায়গা থাকে, তাহলে বাস্তবে ১০০টি গাড়ি আটক করা সম্ভব নয়। কারণ আটক করার পর যানবাহন নিরাপদে সংরক্ষণের দায়িত্বও পুলিশের।
ফলে অভিযান আছে, মামলা হচ্ছে, জরিমানাও হচ্ছে—কিন্তু আটকের পর সংরক্ষণের অবকাঠামো না থাকায় আইন প্রয়োগের শেষ ধাপেই আটকে যাচ্ছে কার্যকর ব্যবস্থা।
আর এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে নগরীর যানজট, অবৈধ পার্কিং ও জনদুর্ভোগ। নগরীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় শোরুম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্রেতাদের গাড়িও সড়কের ওপর রাখা হচ্ছে। এতে রাস্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে যান চলাচলে তৈরি হচ্ছে ধীরগতি ও দীর্ঘ যানজট।
১০০ গাড়ি আটকের সুযোগ, জায়গা ২০টির
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো যানবাহন আটক করা মানেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ নয়। সেটি নিরাপদে সংরক্ষণ, মালিকানা ও মামলার তথ্য সংরক্ষণ এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও পুলিশের। ফলে পর্যাপ্ত জায়গা ছাড়া অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন আটক করা বাস্তবে কঠিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক কর্মকর্তা মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘ধরুন ১০০টি গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু যদি ২০টি গাড়ি রাখার মতো জায়গা থাকে, তাহলে বাস্তবে ১০০টি গাড়ি আটক করা সম্ভব নয়। আটক করার পর গাড়িগুলো নিরাপদে রাখা পুলিশের দায়িত্ব। ফলে জায়গার সংকট সরাসরি পুলিশের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাকে সীমিত করছে।’
ট্রাফিক বিভাগের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আইন অমান্যকারী যানবাহন আটক করার পর সেটি কোথায় রাখা হবে—অভিযানের সময় অনেক ক্ষেত্রে সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়। জায়গা না থাকলে গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন যানবাহনের ক্ষেত্রে মামলা বা জরিমানা করে ছেড়ে দিতে হয়।
এতে তৈরি হচ্ছে আরেক সমস্যা। সামান্য জরিমানা দিয়ে ছাড়া পাওয়ার পর একই যানবাহন আবারও আইন ভাঙছে। ফলে অভিযান হচ্ছে, মামলা হচ্ছে, জরিমানাও হচ্ছে; কিন্তু সড়ক থেকে অনিয়মকারী যানবাহনের সংখ্যা স্থায়ীভাবে কমছে না।
হেলেনাবাদের জায়গাটিও অস্থায়ী
বর্তমানে নগরের হেলেনাবাদ এলাকায় একটি সরকারি কোয়ার্টারের পাশে ছোট একটি জায়গা অনেকটা অস্থায়ী ডাম্পিং হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাফিক বিভাগ। তবে জায়গাটি পূর্ণাঙ্গ ডাম্পিং স্টেশনের বিকল্প নয়।
জায়গাটি মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) কোয়ার্টারের অংশ। আবাসিক এলাকার পাশে হওয়ায় সেখানে বিপুলসংখ্যক জব্দ করা যানবাহন রাখার সুযোগও সীমিত। জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য পিডব্লিউডির পক্ষ থেকে একাধিকবার ট্রাফিক বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জায়গাটি ব্যবহারের সুযোগ রাখার অনুরোধ করেছে ট্রাফিক বিভাগ।
ফলে অস্থায়ী জায়গাটিতে গাড়ি জমতে শুরু করলেই নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। একদিকে জায়গার স্বল্পতা, অন্যদিকে জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার চাপ—দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
একদিনেই ২৫ যান আটক
ডাম্পিং সংকটের মধ্যেও অভিযান থেমে নেই। গত ৩ আগস্ট আরএমপির ট্রাফিক বিভাগ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ অভিযান চালানো হয়।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, ইজিবাইক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে ৩৮টি মামলা করা হয়। আটক করা হয় ২৫টি যানবাহন।
এটি কেবল একটি দিনের চিত্র। নিয়মিত অভিযানেও আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু জব্দ করা যানবাহন দীর্ঘ সময় রাখার মতো জায়গা না থাকায় সব যানবাহনের বিরুদ্ধে একই মাত্রায় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষ করে অটোরিকশা ও অন্যান্য তিন চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি বেশি প্রকট বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এর পাশাপাশি মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও মিনিবাসের বিরুদ্ধেও নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হয়।
৩৪ বছরেও হয়নি স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন
১৯৯২ সালের ১ জুলাই চারটি থানা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল রাজশাহী মহানগর পুলিশ। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে নগরের পরিধি, জনসংখ্যা ও যানবাহন। বেড়েছে পুলিশের দায়িত্বও।
বর্তমানে আরএমপির অধীনে রয়েছে ১২টি থানা ও ট্রাফিক বিভাগসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট। আরএমপির তথ্য অনুযায়ী, মহানগর পুলিশের এখতিয়ার প্রায় ৪৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত।
জুলাইয়ে ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে ৩৫তম বছরে পদার্পণ করেছে আরএমপি। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও ট্রাফিক পুলিশের জন্য স্থায়ী ও পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্টেশন গড়ে ওঠেনি।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, মহানগরের পরিধি ও যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রয়োজনীয় অবকাঠামোটি কেন এখনও অস্থায়ী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল?
ডাম্পিং সংকটের সঙ্গে পার্কিং দুর্ভোগ
শুধু আটক যানবাহন রাখার জায়গার সংকট নয়, নগরীর যানজটের বড় কারণ হয়ে উঠেছে অপরিকল্পিত পার্কিংও।
সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, মনিচত্বর, কাদিরগঞ্জ, রেলগেট ও তালাইমারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যস্ত সময়ে সড়কের পাশে গাড়ি রাখা নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে বড় শোরুম, বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামনে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় ক্রেতাদের গাড়ি সড়কেই রাখতে দেখা যায়।
রাজশাহীর বিভিন্ন বড় শোরুমের সামনে ব্যস্ত সময়ে গাড়ির চাপ তৈরি হওয়ায় সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে যায়। একটি গাড়ি রাস্তার পাশে দাঁড় করানোর পর তার পেছনে তৈরি হয় ধীরগতির যানবাহনের সারি। পরে সেটিই রূপ নেয় যানজটে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না রেখেই ব্যবসা পরিচালনা করে, তাহলে তাদের ক্রেতাদের গাড়ির চাপের দায় কে নেবে?
সড়কে এর প্রভাব সরাসরি
ডাম্পিং স্টেশনের সংকটের প্রভাব শুধু পুলিশের অভিযানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরের যানজট, অবৈধ পার্কিং, সড়কে বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, মনিচত্বর, কাদিরগঞ্জ, রেলগেট ও তালাইমারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যানবাহনের চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে যত্রতত্র পার্কিং ও আইন অমান্যকারী যানবাহনের চলাচল।
রাজশাহী জেলা ও মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় ১৩৫টি এবং মহানগরে ৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মোট ১৬০ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ১৬৯টি মামলা হয়েছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এ ছাড়া প্রায় ৪০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক বা ডাম্প ট্রাকের কারণে।
অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য, চালকের প্রশিক্ষণের ঘাটতি, লাইসেন্স না থাকা ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘পুলিশের চোখের সামনে দিয়েই চলে’
নগরীর উপশহরের বাসিন্দা ইবরার আহমেদ (তুষার) মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘রাজশাহীতে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটছে। ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে লাইসেন্সবিহীন ও আইন অমান্যকারী যানবাহন চলাচল করে। পুলিশ এসব গাড়ি আটক করে জব্দ করতে পারলে সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের সংখ্যা কমত।’
সচেতন নাগরিক শাহারিয়ার কবির মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন শহর। কিন্তু সড়ক ব্যবস্থাপনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের কারণে অনেক সময় রাস্তা দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক যানবাহনের আবার সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সও নেই। এসবের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর অভিযান প্রয়োজন।’
ঝুঁকিপূর্ণ গাড়িকে আগে ধরছে পুলিশ
ট্রাফিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অভিযান চালাতে হচ্ছে। অর্থাৎ যেসব যানবাহন তাৎক্ষণিকভাবে বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে, সেগুলো আগে আটক করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আইন অমান্যকারী অনেক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা বা জরিমানা করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কারণ আটক করলে সেটি রাখার জায়গা নেই।
এভাবে একটি যানবাহন একবার জরিমানা দিয়ে ছাড়া পাওয়ার পর আবার একই অপরাধে জড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। ফলে পুলিশের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা থাকলেও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে তার পূর্ণ প্রয়োগ হচ্ছে না।
‘ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় পুলিশের কাজেও ব্যাঘাত’
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘রাজশাহীতে যেসব স্থানে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, সেগুলোর অধিকাংশই এক লেনের সড়ক। এর সঙ্গে অতিরিক্ত অবৈধ যানবাহন, চালকদের অসাবধানতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।’
তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের জন্য আলাদা ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় তাদের কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে। রাজশাহীর সড়কগুলো অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর উপযোগী নয়। গতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কিন্তু অনেক চালক ঘণ্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার গতিতেও গাড়ি চালান। কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিতে হলে ডাম্পিং স্টেশন প্রয়োজন।’
‘একটির বদলে একাধিক ডাম্পিং স্টেশন দরকার’
রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘মহানগরের আয়তন এখন আর আগের মতো ছোট নেই। যানবাহনের সংখ্যাও বেড়েছে। এ অবস্থায় ট্রাফিক বিভাগের জন্য একটি স্থায়ী ও নিরাপদ ডাম্পিং স্টেশন অত্যন্ত জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘সম্ভব হলে মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় এলাকাভিত্তিক ডাম্পিং স্টেশন করা দরকার। কারণ কোনো এলাকায় অভিযান চালিয়ে গাড়ি আটক করে দূরের ডাম্পিং স্টেশনে নিতে গেলে পুলিশের সময় ও শ্রম দুটোই বেশি ব্যয় হয়।’
নূর আলম সিদ্দিকী আরও বলেন, ‘অন্তত একটি স্থায়ী, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত জায়গাসম্পন্ন ডাম্পিং স্টেশন এখনই প্রয়োজন। সেখানে বিপুলসংখ্যক জব্দ করা যানবাহন নিরাপদে রাখার পাশাপাশি জব্দ করা গাড়ির তথ্য, মালিকানা, মামলা ও আদালতের আদেশ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।’
‘উপযুক্ত জায়গা খুঁজছি’
আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘ডাম্পিং স্টেশন তৈরি হলে শুধু পুলিশের অভিযান পরিচালনা সহজ হবে না, নগরের যানজট, অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জায়গা খুঁজছি। উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলে জেলা প্রশাসকের কাছে বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে। এ বিষয়ে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জায়গা বরাদ্দের বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।’
‘আবেদন পেলে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা’
রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহিনুল হাসান মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আরএমপির পক্ষ থেকে একটি আবেদন করা হয়েছে। তারা যদি সরকারি জমি চায়, তাহলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে জমি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সবুজ নগরী রাজশাহীর স্বার্থে আবেদনটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
‘সমাধানের জন্য পরিকল্পনা রয়েছে’
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যতদূর সম্ভব এ ধরনের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এ বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। নগরীর যানবাহন ব্যবস্থাপনা, সড়কে শৃঙ্খলা এবং নাগরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও সবুজ রাজশাহীকে আরও এগিয়ে নিতে আমরা বদ্ধপরিকর।’
অভিযান আছে, আটকে যাচ্ছে শেষ ধাপ
রাজশাহীতে ট্রাফিক পুলিশের অভিযান নেই—বিষয়টি এমন নয়। মামলা হচ্ছে, জরিমানা হচ্ছে, যানবাহন আটকও হচ্ছে। কিন্তু আইন ভাঙার পর যানবাহনটিকে সড়ক থেকে সরিয়ে নিরাপদে রাখার পরবর্তী ধাপেই তৈরি হচ্ছে বড় শূন্যতা।
একদিকে বাড়ছে যানবাহন, অন্যদিকে বাড়ছে সড়কের ওপর চাপ। বাড়ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামনে পার্কিং সংকট। অথচ পুলিশের হাতে থাকা অস্থায়ী জায়গায় জব্দ করা যানবাহন রাখার সক্ষমতা সীমিত।
ফলে অভিযান চালানোর আগেই জায়গার হিসাব করতে হচ্ছে পুলিশকে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—যে গাড়ি আইন ভাঙছে, পুলিশ সেটি আটক করার ক্ষমতা রাখলেও যদি আটকের পর রাখার জায়গা না থাকে, তাহলে আইন প্রয়োগ কতটা কার্যকর?
রাজশাহীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে তাই শুধু অভিযান বাড়ানো নয়; প্রয়োজন স্থায়ী ও পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্টেশন, পরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্কিং ব্যবস্থার কঠোর তদারকি।
কারণ মামলা করে গাড়ি ছেড়ে দিলে অপরাধের চক্র থামে না। আইন ভাঙা যানবাহনকে সড়ক থেকে সরিয়ে রাখার সক্ষমতা তৈরি না হলে, অভিযান চলবে—কিন্তু সড়কে অনিয়মও চলতেই থাকবে।



