
রাজশাহীর হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনে মাত্র তিন মিনিটের যাত্রাবিরতিতে চলন্ত ট্রেনের ওয়াগন থেকে তেল নামানোর অভিযোগ উঠেছে। রেলওয়ের এক ওয়েম্যানসহ অন্তত সাতজনকে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ভিডিওটি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কন্ট্রোল রুমের নজরে আসার পর সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে ঈশ্বরদীগামী ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন’ ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত একটি ওয়াগন থেকে তেল নামানোর এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। ট্রেনটি হরিয়ান স্টেশনে যাত্রাবিরতির সময় কয়েকজনকে ওয়াগনের ওপর উঠে তেল নামাতে দেখা যায় ভিডিওতে।

রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে আন্তনগর ঢাকাগামী ট্রেনের পাওয়ারকারে তেল সরবরাহের জন্য দুটি ওয়াগন আনা হয়েছিল। তেল সরবরাহ শেষে ওয়াগন দুটি ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন’ ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত করে ঈশ্বরদীতে নেওয়া হচ্ছিল। লোকাল ট্রেন হওয়ায় হরিয়ান স্টেশনে ট্রেনটি যাত্রাবিরতি দেয়। মাত্র তিন মিনিটের ওই বিরতির মধ্যেই ওয়াগন থেকে তেল নামানোর ঘটনা ঘটে।
তবে ঠিক কী পরিমাণ তেল নেওয়া হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভিডিওতে যা দেখা গেছে
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে হরিয়ান রূপসীডাঙ্গার রিপন, হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশন এলাকার নজরুল ইসলাম নজু, শরিফুল ইসলাম, কিরন, রক্সি ও মিলনসহ কয়েকজনকে দেখা যায়। কয়েকজনকে ওয়াগনের ওপরে এবং অন্যদের রেললাইনের পাশে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, মাস্ক পরা এক ব্যক্তি—যাকে স্থানীয়রা ওয়েম্যান কিরন আলী বলে শনাক্ত করেছেন—ওয়াগন থেকে একটি সাদা বস্তা নিচে নামিয়ে দিচ্ছেন। নিচে থাকা কয়েকজন সেটি নিয়ে সরে যান। পরে ওয়াগনের ভেতর থেকে তেল বের করে ছোট বালতি ও জারকিন নিচে নামানো হয়।
ট্রেন চলতে শুরু করলে কয়েকজন দ্রুত নেমে যান। এ সময় নীল টি-শার্ট পরা এক যুবক চলন্ত ট্রেনের পেছনে দৌড়ে এসে ওয়াগন থেকে নামানো একটি তেলভর্তি জারকিন নিয়ে সরে যান। ওয়াগনে থাকা আরেকজনও পরে নেমে যান। তবে কিরন আলীকে শেষ পর্যন্ত ওয়াগনের ওপর থাকতে দেখা যায়। সবশেষে তিনি একটি জগে করে তেল নিয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে যান বলে ভিডিওতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিতই তেল চুরি
স্থানীয়দের অভিযোগ, হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ট্রেন থেকে তেল চুরির ঘটনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে তেল চুরি হয়ে আসছে। সাধারণত রাতের বেলায় এমন ঘটনা ঘটলেও মাঝেমধ্যে দিনের বেলায়ও তেল নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবারের ঘটনার সময় ওয়েম্যান কিরন আলী, তাঁর ভাই নয়ন ও মিলনসহ কয়েকজন সেখানে ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তারা ওয়াগনে উঠে জার, বোতল ও জগে করে তেল নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে যান বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
ওয়েম্যানদের যোগসাজশের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একটি সূত্রের দাবি, ওয়েম্যানদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বহিরাগতরা ট্রেনের ওয়াগন থেকে তেল নেওয়ার সঙ্গে জড়িত। অভিযোগের তীর কিরন আলীর দিকেও।
সূত্রটি জানায়, কিরন আলী নেসকোর কাটাখালী বিদ্যুৎ স্টেশন সাইডিং লাইনের টিএলআর ওয়েম্যান। নেসকোর লাইনে দায়িত্ব থাকলেও মেট কামরুল ইসলাম তাকে মূল লাইনে কাজ করান বলে অভিযোগ রয়েছে। মেট কামরুলের সঙ্গে যোগসাজশে কিরন বিভিন্ন সময় এমন কর্মকাণ্ডে জড়ান বলেও অভিযোগ করেছে সূত্রটি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কিরন আলী। তিনি বলেন, ‘তেল নেওয়ার ঘটনায় আমার ছোট ভাই নয়নসহ অন্যরা জড়িত ছিলেন। নয়ন তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন এলাকায় কাজ করছিল।’ এ বিষয়ে মেট কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধান মিস্ত্রি কামরুল ইসলামের সঙ্গে মিলন ও কিরন আলীর দীর্ঘদিনের সখ্য রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে কামরুল ইসলাম বলেন, সকালে ট্রেন এলে তাদের পানি খাওয়ার জন্য আধা ঘণ্টা বিরতি দেওয়া হয়। এ সময় যে যার মতো সময় কাটায়। কিরন তাকে কিছু না বলে কোথায় গিয়েছিলেন, তা তিনি বলতে পারবেন না।
স্টেশন মাস্টারের বক্তব্য
হরিয়ান স্টেশন মাস্টার মনিরুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আজকে আমার ডিউটি ছিল না। আর পরিবহনের মালামালের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব আমার নয়।’
পরে দায়িত্বে থাকা স্টেশন মাস্টার আরিফ হোসেন মনবকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন ট্রেন হরিয়ান স্টেশনে মাত্র তিন মিনিট দাঁড়ায়। তখন পাবনা থেকে ঢালারচর এক্সপ্রেস ট্রেন আসছিল। ওই ট্রেনে রেলওয়ের কর্মকর্তারা ছিলেন। ট্রেন ক্রসিং নিয়ে আমরা ব্যস্ত ছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা মেল সিক্স ডাউন ছেড়ে দেওয়ার সময় চিৎকার শুনতে পাই। বাইরে এসে দেখি তিনজন ট্রেনের সঙ্গে দৌড়াচ্ছেন। পরে কন্ট্রোল রুম থেকে ফোন করে জানানো হয়, ওয়াগন থেকে কিছু নামানো হয়েছে। ওয়াগনের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরএনবি ও জিআরপি পুলিশের। বিষয়টি তারা ভালো বলতে পারবে।’
গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে
এ বিষয়ে কাটাখালী থানার সদ্য যোগদানকারী অফিসার ইনচার্জ নুরুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আরএনবি চিফ কমান্ড্যান্ট আশাবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠিয়েছিলাম। তবে তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি। ভিডিওটি দেখেছি। তাদের চেনা যাচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা হবে। তাদের আটকে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পিডব্লিউ মো. বাকিতুল্লাহ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিচ্ছি। যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ভিডিও ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ওয়াগন থেকে ঠিক কত পরিমাণ তেল নেওয়া হয়েছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হিসাব-নিকাশ করছে।


