
রাজশাহীতে এক সময় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) কোনো ভবন ছিল না। ছিল না নিজস্ব কোনো জায়গা। সিটি করপোরেশন হওয়ার আগে রাজশাহী পৌরসভা (রামপুর-বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি) নামে এটি পরিচিত ছিল। রাজশাহী পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর এটি টিনসেট ছিল। টিনসেটে চলতো পৌরসভার কার্যক্রম। যদিও রাসিকে উত্তরণের আগে দুটিস্থানে এর কার্যক্রম চলেছে। প্রথম দিকে ভুবনমোন পার্কে, দ্বিতীয়বার সোনাদীঘির পাড় ও রাজশাহী কলেজ থেকেও পৌরসভা দপ্তর পরিচালিত হয়েছে।
মিজানুর রহমান মিনু প্রথম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর রাসিককে স্থায়ী করণের উদ্যোগ নেন। মিজানুর রহমান মিনু প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর সিটি করপোরেশনের জায়গা নির্ধারণ করেন ও পরে তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বর্তমান যে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বহুতল ভবনটি রয়েছে এটির নির্মাতা বা স্থপতি মিজানুর রহমান মিনু। এছাড়াও রাসিকের স্বপ্নচুড়া, দারুচিনি প্লাজা ও বৈখাশী বাজারী মার্কেটের প্ল্যান পরিকল্পনাও করেছিলেন মিজানুর রহমান মিনু। নগর ভবনের নির্মাণ শৈলি এতোটাই নিখুত ছিল যা সারা বাংলাদেশে এমন দৃষ্টিনন্দন আধুনিক আর ছিল না। ওই সময় রাজশাহীতে এক মাত্র নগর ভবন ছিল অত্যাধুনিক। যার পরিকল্পনায় ছিলেন মিজানুর রহমান মিনু।
জানা গেছে, ১৮৭৬ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভুবন মোহন পার্কের অভ্যন্তরে টিন সেডের দুটি কক্ষে এর কাযর্ক্রম শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পৌর কর্পোরেশন থেকে রুপান্তরিত হয়ে সিটি কর্পোরেশন হয়। এরমধ্যে বেশ কয়েকবার এই পৌর করপোরেশনের পট পরিবর্তন হয়েছে। হয়েছে স্থানান্তর। মিউনিসিপ্যাল কমিটির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার আয়তন ছিল ৬.৬৪ বর্গ মাইল পশ্চিমে হড়গ্রাম বাজার থেকে পূবে রুয়েট পযর্ন্ত ছিল এর এলাকা। রাজশাহী পৌরসভা পরে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর এর আয়তন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। রাজশাহী পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে রুপান্তরিত হওয়ার পর প্রথম মেয়র ছিলেন আব্দুল হাদি। এরপর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন মিজানুর রহমান মিনু। রাসিকে মিজানুর রহমান মিনু নির্বাচিত হওয়ার পর এর অবস্থা ছিল জরাজীর্ণ। দন্যদশায় থাকা রাজশাহী সিটি করপোরেশন ১৯৯১ সালের পর প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরপরই মিজানুর রহমান মিনু রাসিককে ঢেলে সাজাতে শুরু করেন। ওয়ার্ডের পাশাপাশি এর পরিধি বৃদ্ধি করেন। সাথে রাসিকের আধুনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্প করেন। মিজানুর রহমান মিনুর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারী নগর ভবনের দ্বার উম্মোচিত হয়। মুলত ১৯৯৭ সাল থেকে নগর ভবনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়। এটি চলে ২০০২ সাল পর্যন্ত। সেই সময় প্রায় ৯ কোটি ৯৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ে রাসিকের বহুতল আধুনিক ভবন নির্মাণ করেন মিজানুর রহমান মিনু। রাসিক ভবন নির্মাণকাল ছিল মুলত ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। সেই সময় যে টাকা ব্যয়ে নগর ভবন নির্মাণ হয়েছে তা বর্তমানে প্রায় শত কোটি টাকার সমান। মিজানুর রহমান মিনুর নির্মিত নগর ভবন এমন নিখুদভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল যা পুরো বাংলাদেশে একটি নজির সৃষ্টি হয়। এমন আধুনিক ভবন এখন পর্যন্ত পুরো উত্তরাঞ্চলে নেই বললেই চলে। আর এটি সম্ভব করেছিলেন মিজানুর রহমান।
শুধু নগর ভবনই নয়, সিটি সেন্টার, স্বপ্ন্নচূড়া, দারুচিনি প্লাজা ও বৈখাশী বাজারী মার্কেটের প্ল্যান পরিকল্পনাও করেছিলেন তৎকালীন রাসিক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু। রাসিকের নিজস্ব অর্থায়নে এসব ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। যদিও অনেক দুর্নীতি অনিয়নের মধ্যে স্বপ্ন্নচুড়া, বৈখাশী বাজারী মার্কেটের ভবনটি নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু দারুচিনি প্লাজা আলোর মুখ দেখেনি। মেয়র ও পরে এমপি থাকাকালীন সময় মিজানুর রহমান মিনু এই তিনটি মার্কেটের নকশা করে আধুনিক মানের ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নেন। প্রথম পর্যায়ের টেন্ডারও করা হয়েছিল মিজানুর রহমান মিনুর উদ্যোগে। কিন্তু পরবর্তিতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব কাজ মুখথুবড়ে পড়ে। অনেক দেনা পাওয়ানার মধ্যে স্বপ্নচূড়া ও বৈখাশী বাজারের কাজ শেষ হলেও ব্যবসা বাণিজ্যের কোনো উন্নয়ন হয়নি। বরং নির্মাণ হওয়া ভবন দুটি আত্মীয়করণ করে ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়ালকে দিয়ে দেয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, স্বপ্নচুড়া ভবন রাসিকের হলেও আওয়ামী লীগের মেয়র লিটন সেখানে নার্সিং কলেজ স্থাপন করেছিলেন। মিজানুর রহমান মিনু রাসিকের মেয়র থাকার সময় যাবতীয় উন্নয়ন করে গেলেও এর সুফল ভোগ করেন আওয়ামী লীগের সময়কার মেয়র লিটন। লিটন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই রাসিক ভবন রাজনৈতিক কার্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। এখান থেকে পরিচালিত হতো রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিজানুর রহমান মিনু নির্বাচিত হলেও রাজশাহী সদর আসনে আবারো উন্নয়ন হবে এমনটা মনে করছেন নগরবাসি।



