
মৌসুমী দাস, চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ একসময় রাজশাহীর চারঘাটের গ্রামবাংলায় সকাল কিংবা দুপুরের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসত সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ। কাঁধে ডাকের ব্যাগ ঝুলিয়ে পথে পথে ছুটে বেড়াতেন ডাকপিয়ন। তার আগমনের সাথে জড়িয়ে থাকত মানুষের কৌতূহল হয়তো প্রিয়জনের চিঠি এসেছে।
একটি চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। দূর শহরে থাকা সন্তান, প্রবাসী স্বজন কিংবা প্রিয় মানুষের হাতে লেখা কয়েকটি কথা পৌঁছাতে সময় লাগলেও সেই অপেক্ষার মধ্যেই ছিল অন্যরকম আনন্দ। ডাকপিয়নের হাতে একটি খাম পৌঁছানোর পর সেটিকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হতো আবেগঘন মুহূর্ত।

চারঘাট উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও একসময় এমন দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। সাইকেল চালিয়ে ডাকপিয়ন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে পৌঁছে দিতেন চিঠি, চাকরির নিয়োগপত্র, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কিংবা দূরদেশে থাকা স্বজনের খবর। অনেকের কাছে তার আগমন ছিল আনন্দের বার্তা বহন করার মতো।
হাতে লেখা চিঠি ছিলো আলাদ আনন্দ। পরিচিত মানুষের হাতের লেখা, কাগজে জমে থাকা অনুভূতি আর মনের না বলা কথাগুলো বারবার পড়েও যেন শেষ হতো না। কেউ কেউ সেই চিঠি বছরের পর বছর যত্ন করে রেখে দিতেন সিন্দুক, আলমারি কিংবা বইয়ের ভাঁজে। সময় পেরিয়ে গেলেও সেসব চিঠি হয়ে উঠত জীবনের মূল্যবান স্মৃতি।
তবে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে বদলে গেছে সেই চিত্র। মুঠোফোন, ইন্টারনেট, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভিডিও কল এখন যোগাযোগকে করেছে সহজ ও তাৎক্ষণিক। কয়েক সেকেন্ডেই দূর-দূরান্তের মানুষের সাথে কথা বলা কিংবা বার্তা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত চিঠির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে এসেছে।
সরেজমিনে চারঘাট উপজেলার সরদহ ইউনিয়নের ঝিকরা বাজারের পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, আগের মতো ব্যক্তিগত চিঠির আনাগোনা নেই। চিঠির জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ও চোখে পড়ে না। ডাকঘরের কার্যক্রম থাকলেও মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগের বড় অংশই এখন চলে গেছে ডিজিটাল মাধ্যমের দখলে।
ঝিকরা বাজারের পোস্ট মাস্টার আকবর আলী বলেন, আগে ব্যক্তিগত চিঠির জন্য মানুষের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। দূরের স্বজনের চিঠি আসবে এই আশায় অনেকে পোস্ট অফিসে খোঁজ নিতেন। ডাকপিয়ন এলাকায় গেলে তাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আলাদা আনন্দ ও কৌতূহল দেখা যেত। এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কারণে মুহূর্তের মধ্যেই যোগাযোগ করা যায়। তাই ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
ঝিকরা বাজারের স্থানীয় ডাককর্মী খোয়াজ আলী বলেন, একসময় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছে চিঠি পৌঁছে দিতে যেতে হতো। ডাকপিয়নের পরিচিত মুখ ও সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ ছিল গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এখন যোগাযোগের মাধ্যম বদলে যাওয়ায় সেই ব্যস্ততা আর নেই। ডাকপিয়নের কাজের ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন।
সরদহ ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, আগে একটা চিঠির জন্য অনেক অপেক্ষা করতাম। ডাকপিয়নকে দূর থেকে দেখলেই মনে হতো, হয়তো আমার বাড়ির চিঠি আছে। চিঠি হাতে পাওয়ার পর পরিবারের সবাই মিলে পড়তাম। এখন মোবাইলে মুহূর্তেই খবর পাওয়া যায়, কিন্তু সেই সময়ের আনন্দটা আর পাওয়া যায় না।
প্রবীণদের স্মৃতিতে ডাকপিয়ন শুধু একজন বার্তাবাহক ছিলেন না৷ তিনি ছিলেন অপেক্ষার অবসান ঘটানো একজন পরিচিত মানুষ। তার হাতে আসা একটি খাম কখনো এনে দিত প্রবাসী সন্তানের খবর, কখনো স্বজনের ভালো-মন্দের সংবাদ, আবার কখনো বদলে দিত কারও জীবনের গতিপথ।
আজকের প্রজন্মের কাছে হাতে লেখা চিঠি অনেকটাই অপরিচিত। তাদের যোগাযোগের জগৎ গড়ে উঠেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তাৎক্ষণিক বার্তার ওপর। তবু চারঘাটের প্রবীণদের স্মৃতিতে চিঠির সেই দিন এখনো উজ্জ্বল।
চিঠির ব্যবহার হয়তো কমে গেছে, ডাকপিয়নের সেই ব্যস্ত দিনও পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু একটি ছোট্ট খামের ভেতর প্রিয় মানুষের হাতের লেখা, অপেক্ষার আবেগ আর ভালোবাসার যে গল্প লুকিয়ে থাকত সেটি আজও চারঘাটের মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে।


