
মোঃ হুজাইফা, রাজশাহী (সদর) প্রতিনিধিঃ
রাজশাহী মহানগরীতে উদ্বেগজনক ভাবে বেড়েছে রক্তচোষা মশার উপদ্রব। দিনে এবং রাতে সব সময় মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে মহানগরবাসী। সুর্যস্তের আগেই ঘরের ভেতর ভন ভন করে উড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য রক্তচোষা মশা, আর রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা যেন পরিণত হয়ে উঠছে এক নীরব যন্ত্রণায় । মশার উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে কেউ আগুন জ্বালিয়ে মশা তাড়ানো ধোঁয়া সৃষ্টি করছেন, কেউ মশারি টাঙিয়েছেন, কেউ জ্বালাচ্ছেন কয়েল, আবার কেউ মশা নিধনের স্প্রে ব্যবহার করছেন । কিন্তু তাতেও মিলছে না শান্তি, ফলে এই রক্তচোষা মশার কারণে রাজশাহী শান্তির নগর থেকে অশান্তির আর যন্ত্রণাময় নগরী হয়ে উঠেছে ।

শনিবার দুপুর ১২ টায় নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় রাজশাহী মহানগর বাসীর অনেকেই অভিযোগ করে বলেন , রক্তচোষা মশা দমনে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করেনি এবং চোখেও পড়েনি। আগে মাঝে মধ্যে কেরোসিন ছিটানো কিংবা সীমিত ফগিং কার্যক্রম চালানো হতো, এবং বিষ স্প্রে করা হতো। এখন এইসব উদ্যোগ নাই বলেই রক্তচোষা মশা কমার পরিবর্তে দিন দিন যেন আরও বেড়েই চলছে।

রাজশাহীতে ড্রেন- নালা ও জলাবদ্ধতায় বাড়ছে মশার প্রজনন
ফগিং ও মশা নিধন কার্যক্রম জোরদারের দাবি রাজশাহীবাসীর
বিশিষ্টজনদের সতর্কবার্তা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে বাড়তে পারে ডেঙ্গু ঝুঁকি
ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোঃ আতিক আলী বলেন , গরম আসার আগেই শীত মৌসুম শেষ না হতেই যে হারে মশার বংশবিস্তার দ্রুত বাড়ছে তা দ্রুতই নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন । তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ন ঘন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, পাশাপাশি ময়লা আবর্জনায় জলাবদ্ধতার কারণে প্রচুর মশার লার্ভার সৃষ্টি করছে ড্রেন গুলোতে , যার ফলে নগরীতে মশার প্রাদুর্ভাব নিয়মিত বাড়ছে।
তিনি আরোও বলেন, সামনে বর্ষা মৌসুম আসায় এখন থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিতে পড়তে পারে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। তাই দেরি না করে, মশা নিধনের জন্য কীটনাশক ও ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না থেকে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পানি জমে থাকা স্থান পরিষ্কার এবং নাগরিকদের নিয়মিত সচেতন করার মাধ্যমে সকলের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে, বলে মন্তব্য করেছেন তিনি ।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ড্রেন, নালা, খাল ও পুকুরের পানি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় সেখানে জমেছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। এসব নোংরা পানিই এখন মশার নিরাপদ প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এর প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মোঃ মামুন বলেন, প্রতি বছর এই সময়ে মশার উৎপাত বেশি থাকে। আর আবহাওয়াজনিত কারণেই এই সময়টা মশা প্রজননের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সময়, আসলে এই সময়ে দেশে ২৮ ডিগ্রি থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে, যা মশার বংশ বিস্তারের জন্য উপযোগী। আর এমন অবস্থা প্রতিবছরই হয়ে থাকে, আমরা রাজশাহীর জনগণকে নিয়ে এই পরিস্থিতি আগেও কন্ট্রোলে আনার চেষ্টা করেছি, এবারও আমরা অলরেডি কার্যক্রম শুরু করেছি, আশা করছি এবারও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো।
পরে তিনি সাধারণ জনগণকে তাদের আশেপাশের সকল অপরিচ্ছন্ন জায়গা পরিষ্কার রাখতে অনুরোধ করেন।
রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকার বাসিন্দা মোঃ ওবায়দুল বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই মশা নিধনের কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে দেখা যাচ্ছে না। যার ফলে বাড়িতে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ভোগান্তির মধ্যেই থাকতে হচ্ছে, আতংকে থাকতে হচ্ছে । কখন আবার বড় কোন রোগে আক্রান্ত হতে হয়।
তিনি দাবি করে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ অথবা ওয়ার্ডের পক্ষ হতে মশা নিধনের কার্যকর ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরোও বলেন , এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে দিনের বেলাতেও মশারি না টানলে বাচ্চাদের মশার কামড় থেকে রক্ষা করা যায় না। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মশার তাণ্ডব শুরু হয়। পুকুর আর আশপাশের নালা-নর্দমা থেকে অসংখ্য মশা জন্ম নিচ্ছে। আমরা প্রায় দুইশত পরিবারের মানুষ এখানে থাকি, কিন্তু মশা মারার জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা দেখি না। কয়েল জ্বালাই, স্প্রে করি তবুও স্বস্তি মিলে না।
একই অভিযোগ করেন শ্রীরামপুর এলাকার আরেক বাসিন্দা অর্চনা ঘোষ । তিনি বলেন, আগে মাঝে মাঝে সিটি করপোরেশনের লোকজন এসে মেশিনের ধোঁয়া ছিটিয়ে দিত । কিন্তু এখন আর এমন কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। আমরা রাতভর মশার কামড়ে ঘুমাতে পারি না এমনকি দিনের বেলাতেও প্রচুর মশা কামড়ায় ।
এদিকে নগরীর কেশবপুর এলাকার বাসিন্দা কলেজ শিক্ষার্থী সাদিয়া বলেন, মশার কারণে এখন বাসায় বসে থাকাও কঠিন হয়ে গেছে। বাড়িতে বাচ্চারা পড়াশোনা করতে পারে না, রাতে ঘুমাতেও চাই না । কয়েল, স্প্রে সবই ব্যবহার করছি, কিন্তু মশা যেন কিছুতেই কমছে না। মনে হচ্ছে পুরো রাজশাহী শহরটাই এখন মশার দখলে চলে গেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমবিবিএস, এফসিপিএস পার্ট -২ ট্রেইনি, ডিপার্টমেন্ট অফ মেডিসিন এর ডাক্তার, ডা. আহমেদ শিতাব বলেন, দেশে মশাবাহিত রোগ নতুন না, বিগত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের হার বেড়েই চলেছে। আমাদের দেশে কয়েক প্রজাতির মশা আছে । আমাদের আসলে মশাগুলো সম্বন্ধে জানতে হবে। কেননা জানার মাধ্যমেই সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, যেমন এডিস এজিপ্টি, এডিস এলফোবেট্রাস, আসলে এই মশাগুলো ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া রোগ ছড়ায় আবার আমাদের সমাজে কিউলেক্স মশাও আছে, এই কিউলেক্স মশাগুলো আমাদের সারা বছর কামড় দেয় আবার পাহাড়ি অঞ্চলে এনোফ্লোজি মশা হয়,এই মশাটা ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়ে থাকে।
তিনি আরো বলেন, এখন বিষয় হচ্ছে, মূল ডেঙ্গু নিয়ে যেহেতু আমাদের দেশে ডেঙ্গুতে অনেক মানুষ মারা যায়, সেজন্য আমাদের প্রধান কাজ হবে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।যাতে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আসলে ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু মশার ভেতরেই, ডেঙ্গু ভাইরাস, যেটা সেটা আসলে এমন ভাবে বংস বিস্তার করে, যে অধিক ভাইরাস সংক্রামিত হলেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
তিনি আরো বলেন, সকলের বাড়িতে খেয়াল করতে হবে যাতে কোথাও পানি না জমে থাকে। কারণ জলাবদ্ধতা থেকে ডেঙ্গু মশার উৎপত্তি হয়। তাই পরিষ্কার করে ফেলতে হবে প্রয়োজনে কমিউনিটি লেভেলে প্রতি সপ্তাহে ১০ মিনিট করে হলেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাতে হবে।
তিনি সিটি কর্পোরেশনের উদ্দেশ্যে বলেন,মশা ধ্বংস করার জন্য নিয়মিত ফগিং,ইনসেক্টিসাইড এর পাশাপাশি কিছু লার্ভা খেকো মাছ ও চাষ করা যায়। সেই মাছ চাষ করার কথাও তিনি বলেন। গাপ্পি ফিশ সেই ক্ষেত্রে উন্নত অবদান রাখবে বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশল বিভাগের, প্রভাষক মুরশিদা নুসরাত ডেলা বলেন,মশার উপদ্রব কমাতে কিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া উচিত মশা থেকে বিভিন্ন রোগ বালাই হচ্ছে যার মধ্যে ডেঙ্গু অন্যতম।
তিনি বলেন, দেশ ডেঙ্গুর কারণে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা, দীর্ঘদিন ডেনগুলো পরিষ্কার না করা, বাসাবাড়ি থেকে নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ করে যেখান ফেলা হয়, সেই জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করা। যার ফলে দিনের পর দিন সেই জায়গা থেকে মশা উৎপত্তি হয়ে বেশি আকারে ছড়িয়ে পড়ে সিটি কর্পোরেশনের প্রত্যেকটি আনাচে-কানাচে। তিনি বলেন, ময়লা আবর্জনার স্তুপ নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রয়োজনে কীটনাশক, কেরোসিন ও ডিটার্জেন ব্যাবহার করতে হবে এবং উতপত্তি স্থান গুলো ধংস করতে হবে। এর পাশাপাশি তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে, প্রয়োজনে, সভা, সেমিনার এর উদ্যোগ নিতেও আহ্বান করেন।


