
মাদারীপুরের এক সময়ের খরা স্রোত নদ-নদীগুলো আজ মৃত প্রায়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এগুলো বাঁচিয়ে রাখার দরকার থাকলেও নদ-নদীগুলো যৌবন হারিয়েছে। দীর্ঘদিন পরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে মাদারীপুরের নদনদী।
মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, আড়াইশ’ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাদারীপুর জেলার ৫টি উপজেলায় ১৫টি নদ-নদী আছে। নদ-নদীগুলো মধ্যে পদ্মা নদীর ১৭ কিলোমিটার অংশ, কুমার (অপার) ২১ কিলোমিটার, কুমার (লোয়ার) ১২ কিলোমিটার, কাটা কুমার ১৬ কিলোমিটার, কাচিকাটা ১০ কিলোমিটার, আড়িয়াল খা ৮৫ কিলোমিটার, বিলপদ্ম ১৯ কিলোমিটার, নাওডোবা ৩ কিলোমিটার, ময়নাকাটা ১৭ কিলোমিটার, ঘাঘর ১২ কিলোমিটার, টরকী ১১ কিলোমিটার, পালরদী ১৩ কিলোমিটার, কীর্তিনাশা ৬ কিলোমিটার, বিশারকন্দ-বাগদা ৭ কিলোমিটার, মাদারীপুর বিলরুট ১ কিলোমিটার মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে।

জানা গেছে, মাদারীপুর জেলায় গুরুত্বের দিক থেকে প্রধান নদী হচ্ছে পদ্মা। এরপর আড়িয়াল খা, কুমার নদসহ অন্য নদীগুলো তালিকায় রয়েছে। কুমার ও আড়িয়াল খাঁ নদের তীরেই গড়ে উঠেছে মাদারীপুর শহর। মাদারীপুরের কুমার আর আড়িয়াল খা নদে বালু ফেলে অবৈধভাবে বাড়িঘর, দোকানপাটসহ করাতকল বসিয়ে ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। শিবচরের ময়নাকাটা নদী অনেক অংশই ফসলের আবাদ হচ্ছে। কালকিনির পালরদী নদীরও বেশ কিছু অংশ ফসলের জমিতে পরিণত হয়েছে। এসব নদ নদীগুলোতে নতুন নতুন চরও জেগেছে। সঠিক ও পরিকল্পতি ড্রেজিংয়ের অভাবেই গতিপথ হারিয়ে দিনে দিনে নদীর অস্তিত্ব ছোট হয়ে আসছে।
চল্লিশ থেকে ষাটের দশকের মধ্যে জেলার প্রায় ১৪০ বর্গ কিলোমিটার নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। এতে করে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে মাদারীপুরের নদ-নদীগুলো। এক পর্যায়ে নদ-নদীগুলো শুকিয়ে সরু হয়ে যায়। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে মাদারীপুরের রাজৈর-টেকেরহাটের নৌপথের নিম্নকুমার নদের ১৮ কি. মি. সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। দীর্ঘ বছর পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নিম্নকুমার নদ ড্রেজিং করে টেকেরহাটের মূল কুমার নদের সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এর কয়েক বছর পর আবারও একই অবস্থায় ফিরে আসে নিম্নকুমার নদ। এছাড়াও মাদারীপুরের বাঘিয়ার বিল, লখন্ডার বিল, পিতাম্বর বিল, শশীকর বিল, গৈদির বিল, জয়ার বিল, জুয়ারিয়ার বাওড়, পাঁচখোলার বাওড়, বিল পদ্মার বিলসহ আরও বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী বিল থাকলেও দিনে দিনে তা হারিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়াও মাদারীপুর শহরের বিসিক এলাকার কুমার নদের পাড়ে করাত কল ও মাদারীপুরের পাচখোলা এলাকার আড়িয়ার খা নদের পাশে এক কিলোমিটারের মধ্যেই প্রায় ১৫টি ইটভাটা রয়েছে। এতে দূষণে নদগুলো দিনে দিনে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীগুলো কিছুটা যৌবন ফিরে পেলেও শুকনো মৌসুমে তা থাকে না।
একসময় মাদারীপুরের চরমুগরিয়া ও টেকেরহাট বন্দর এলাকার নদ-নদী দিয়ে খুলনা বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় বড় লঞ্চ, স্টিমারসহ নানা নৌযান চললেও আজ তা অতিত। এমনকি কয়েক বছর আগেও মাদারীপুর শহরের লঞ্চঘাট দিয়ে প্রতিদিন লঞ্চ যাতায়াত করতো ঢাকায়। এই জেলার মানুষজনের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ও আরামদায়ক যাত্রা ছিল লঞ্চে করে ঢাকায় যাতায়াত। নদীর গভীরতা না থাকায় আজ আর এই পথ দিয়ে লঞ্চ চলাচল করে না। নতুন প্রজন্মের কাছে লঞ্চযাত্রা রূপকথা।
জানা যায়, কোনো মতে টিকে আছে মাদারীপুর সদর উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদ, কুমার নদও। দীর্ঘদিন ড্রেজিংয়ের অভাবে কোথাও তৈরি হয়েছে বালুচর। হারিয়েছে নাব্য, হারিয়ে জৌলুসও। নেই খরা স্রোত সেই চিরচেনা রূপ। এদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদনদীগুলোকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান মাদারীপুরবাসীর। তা না হলে আগামীতে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় হতে পারে বলে আশঙ্কা সচেতন মহলের।
শিবচরের বাঁশকান্দি গ্রামের শিউলি বেগম বলেন, আমাদের বাড়ির কাছে বিলপদ্মা নদী। এখন অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। এক সময় এই নদী দিয়ে বড় লঞ্চ চলেছে, ট্রলার চলেছে, নৌকা চলেছে। এখন চর পড়েছে। এখন এখানে ফসল চাষ হয়।
মাদারীপুরের লঞ্চঘাট এলাকার তোফায়েল হোসেন বলেন, আমার বয়স এখন আশি ছুঁই ছুঁই। ছোট বয়সে এই আড়িয়াল খা নদের অনেক স্রোত ছিল। এখন আর নেই। বর্ষা মৌসুমে কিছুটা থাকলেও বাকী সময় একেবারে শান্ত আর মরা নদে পরিণত হয়।
মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, দিনে দিনে মাদারীপুরের নদ-নদীগুলো তাদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। নদ-নদীতে ভরা ছিল মাদারীপুর। এই নদী দিয়ে একসময় বড় বড় স্টিমার, জাহাজ চলতো। তখন চরমুগরিয়া ও টেকেরহাট বন্দরে পাট ব্যবসা জমজমাট ছিল। এই নদী পথ দিয়ে ব্যবসা পরিচালিত হতো। আজ আর সেই দৃশ্য নেই। দিনে দিনে যা আছে তাও শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই যদি পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে ভবিষ্যতে নদ-নদীগুলোর অস্তিত্ব টিকে থাকতে কষ্ট হবে। তাই আমি মনে করি মাদারীপুরের এই নদ-নদীগুলোকে রক্ষায় দ্রুত ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদারীপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ হাসান কবির বলেন, মাদারীপুরের নদী খননের কাজগুলো বরিশালের বিআইডব্লিউটিএ থেকে করা হয়েছে। তাই এই খননের ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এই সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য পেতে হলে বরিশালের বিআইডব্লিউটিএ’র কাছ থেকে নিতে হবে।
মাদারীপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল কাদের খান বলেন, নদীর পানি প্রবাহ সচল ও ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে সমীক্ষা করে নদ-নদীগুলোতে দ্রুত ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আপাতত ড্রেজিং করার এমন কোনো প্রকল্প নেই। প্রকল্প পেলে দ্রুত ড্রেজিংয়ের কাজ করা হবে।


