
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘন ঘন ভূমিকম্পের ঘটনা মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এটি টেকটনিক প্লেটের ঘর্ষণ বা ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন হলেও, ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে ভূমিকম্পের সঙ্গে কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ভূমিকম্পকে কিয়ামতের অন্যতম আলামত বা লক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ভূমিকম্প নিয়ে ইসলাম কী বলে, কেন এটি ঘটে এবং কিয়ামতের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী— তা নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। লিখেছেন— সাজ্জাদ হোসেন শরীফ।
কিয়ামতের ভয়াবহ কম্পন
পবিত্র কুরআনে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা বর্ণনায় ‘ভূমিকম্প’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। মহান আল্লাহ কিয়ামতের সূচনা বা মহাপ্রলয়কে ‘প্রচণ্ড প্রকম্পন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হজ্জের ১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে লোকসকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়াবহ ব্যাপার।”
এছাড়া সূরা ‘যিলযাল’ (ভূমিকম্প) নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল হয়েছে, যেখানে কিয়ামত দিবসের ভূমিকম্পের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,“যখন পৃথিবীকে প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত করা হবে। এবং পৃথিবী তার ভেতরের সব বোঝা বের করে দেবে। মানুষ বলবে, এর কী হলো?” (সূরা যিলযাল: ১-৩)
মুফাসসিরদের মতে, এই কম্পন সাধারণ কোনো ভূমিকম্প হবে না, বরং তা হবে চূড়ান্ত বিনাশ, যা পৃথিবীকে লণ্ডভণ্ড করে দেবে।
হাদিসে ভূমিকম্প ও কিয়ামতের আলামত
নবী করীম (সা.) তার উম্মতকে কিয়ামতের পূর্বলক্ষণ হিসেবে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার কথা স্পষ্টভাবে জানিয়ে গেছেন।
সহিহ বুখারির একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,“ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না ইলম (ধর্মীয় জ্ঞান) উঠিয়ে নেওয়া হবে এবং অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে।” (বুখারি: ১০৩৬)
বর্তমান সময়ে ভূতত্ত্ববিদরা স্বীকার করছেন যে, বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্পের প্রবণতা বা ফ্রিকোয়েন্সি আগের চেয়ে বেড়েছে। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ জমানায় এই প্রবণতা আরও তীব্র হবে।
তিনটি বড় ভূমিধস বা ভূমিকম্প
কিয়ামতের বড় ১০টি আলামতের মধ্যে তিনটি বিশেষ ভূমিধস বা বড় ধরনের ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ রয়েছে। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় হুজাইফা ইবনে আসিদ আল-গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, কিয়ামতের আগে ১০টি বড় আলামত দেখা দেবে। এর মধ্যে তিনটি হলো—
১. প্রাচ্যে (পূর্ব দিকে) একটি বড় ভূমিধস।
২. পাশ্চাত্যে (পশ্চিম দিকে) একটি বড় ভূমিধস।
৩. আরব উপদ্বীপে একটি বড় ভূমিধস।
ভূমিকম্প কেন হয়?
ইসলামি স্কলারদের মতে, ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল ভৌগোলিক ঘটনা নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য সতর্কবার্তা। যখন পৃথিবীতে পাপাচু, অশ্লীলতা, সুদ ও জিনা ব্যভিচার বেড়ে যায়, তখন আল্লাহ সতর্ক করার জন্য এমন দুর্যোগ পাঠান।
আয়েশা (রা.)-কে একবার ভূমিকম্পের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,“যখন মানুষ জিনা-ব্যভিচারকে বৈধ মনে করবে, মদ পান করবে এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে মত্ত থাকবে, তখন আল্লাহ তাআলা আত্মমর্যাদাবোধে উদ্দীপ্ত হন এবং জমিনকে বলেন, ‘তুমি ওদের নিয়ে কেঁপে ওঠো’।”
মুমিনদের করণীয়
ভূমিকম্প বা যেকোনো দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং আশ্রয় প্রার্থনা করা মুমিনের কাজ। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) ভূমিকম্পের সময় তার গভর্নরদের দান-সদকা করার নির্দেশ দিতেন।
রাসূল (সা.) প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বেশি বেশি ইস্তেগফার, জিকির এবং নফল নামাজের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। দুর্যোগ বা ভূমিকম্পের সময় ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পড়া এবং আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আলেমরা।
ভূমিকম্প আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়। যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো বিপর্যয় আমাদের গ্রাস করতে পারে। তাই ঘন ঘন ভূমিকম্পকে অবহেলা না করে, একে আল্লাহর সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের শুধরে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


