
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে শরিক নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা অতীতে একসঙ্গে ছিলাম, আছি এবং একসঙ্গেই থাকব। আপনাদের ছেড়ে যাওয়ার কোনো যুক্তিই নেই। তাই আসুন, আগামীতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি।’ সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজের আগে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

জোট নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি ছোট ভাই হিসেবে আপনাদের বলব, আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ, আমাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন, আমরা সবাই মিলে জনগণের প্রত্যাশার জায়গাগুলো আগে খুঁজে বের করে তা পূরণের চেষ্টা করি। এটা করতে গিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো কোনো বিষয়ে দ্বিমত হতে পারে, তবে আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। ভুল বোঝাবুঝিরও কোনো অবকাশ নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় শক্তি হচ্ছে এই দেশের জনগণ। জনগণের সমর্থন বিএনপিসহ সব যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আছে। তাই আমাদের শক্তি ও জোর ততক্ষণই থাকবে, যতক্ষণ জনগণের সমর্থন আমাদের সঙ্গে থাকবে। আর আল্লাহর রহমতে তা আমাদের সঙ্গে আছে। কাজেই আমাদের মধ্যে যদি কোনো বিভেদ না থাকে, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই আমাদের ৩১ দফা কিংবা জুলাই সনদের আলোকে, ইনশাআল্লাহ, সবাই মিলে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
একটি বিশেষ দলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। অথচ আজকে অনেকেই এই সংগ্রামের দাবিদার হতে চায়। আমি নাম উল্লেখ করতে চাই না। তবে যাদের ক্ষেত্রে “গুপ্ত” শব্দটি ব্যবহার করলেই সাধারণ মানুষ তাদের চিনতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে তারা কোথায় ছিল, আমরা অনেক খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। তবে তাদের রাজপথে না পেলেও যারা এই দেশ থেকে পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আমরা তাদের দেখেছি। অথচ ৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পর এই গুপ্ত বাহিনী ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। কাজেই আসুন, এসব গুপ্তদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে এবং দেশের মানুষ আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছে, তা ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধ হই।’
‘৩১ দফা এখন জনগণের ৩১ দফা’
বক্তব্যের শুরুতে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমরা এখানে অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা বাংলাদেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। আমরা যখন এটি উপস্থাপন করেছিলাম, তখন বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক দল সংস্কার নিয়ে বড় বড় কথা বলেছে। কিন্তু সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা তখন সংস্কারের বিষয়ে কিছু বলতে শুনিনি। তবে আজকে এই প্যান্ডেলের নিচে যারা বসে আছি, আমরা একত্রে স্বৈরাচারের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে রাষ্ট্র সংস্কারের দফাগুলো দিয়েছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘কাজেই একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, আমরা সবাই মিলে যে ৩১ দফা রচনা করেছিলাম, বাংলাদেশের জনগণ সেই ৩১ দফার পক্ষে রায় দিয়েছে। এটি এখন বাংলাদেশের জনগণের ৩১ দফা হয়ে গেছে। কাজেই এটি বাস্তবায়নে আমরা যারা সমমনা, সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে।’
‘বিধ্বস্ত দেশ পেয়েছিলাম’
ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কী ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ বছর স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া পুরো দেশ ছিল বিধ্বস্ত। অর্থনীতি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ প্রতিটি ব্যবস্থা ছিল ভঙ্গুর। এই অবস্থায় আমরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছি। তারপরও আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে চেষ্টা করেছি কীভাবে দেশের মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়া যায়। শতভাগ পেরেছি কি না জানি না, তবে আমরা চেষ্টা করেছি এবং করে যাচ্ছি। শতভাগ না হলেও নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবে না যে, একেবারে নতুন একটি সরকার হিসেবে আমরা যেভাবে কাজ করছি, তাতে মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে সক্ষম হয়েছি। আগামীতে সরকার পরিচালনায় সবাইকে আমাদের পাশে থাকার আহ্বান জানাব।’
এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় যমুনায় অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী শরিক দল ও জোট নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন এবং শুভেচ্ছা জানান।
কুশল বিনিময় পর্ব শেষে নেতাদের নিয়ে নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কোরআন তিলাওয়াত করেন ইসলামী ঐক্যজোটের শওকত আমিন।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহানসহ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বুফে টেবিলে শরিক নেতাদের সঙ্গে খাবার নেন এবং তাদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে নৈশভোজে অংশ নেন। ওই টেবিলে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।
এ ছাড়া জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম, সাম্যবাদী দলের নুরুল ইসলাম, ইসলামিক পার্টির আবুল কাসেম, কল্যাণ পার্টির শামসুদ্দিন পারভেজ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার খন্দকার লুৎফুর রহমান, ডেমোক্রেটিক লীগের মহিউদ্দিন কাদরি শওকত, খোকন চন্দ্র দাস, বাংলাদেশ ন্যাপের শাওন সাদেকী, ন্যাপ ভাসানীর আজহারুল ইসলাম, বিকল্পধারা বাংলাদেশের নুরুল আমিন ব্যাপারি, গণদলের এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবদুল করীম, বাংলাদেশ সংখ্যালঘু জনতা পার্টির সুকৃতি কুমার মণ্ডল, গণফোরামের মিজানুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর, ফারুক হাসান, আম জনতা দলের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মিয়া মসিউজ্জামান, আম জনতা দলের তারেক রহমান, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল)-এর সাধারণ সম্পাদক হারুন চৌধুরী, ইউনাইটেড লিবারেল পার্টির আমিনুল ইসলাম, খন্দকার আহসান হাবিব, জনতার অধিকার পার্টির তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, এম এ আর রাজা রহমান, এনডিপির একাংশের কেএস আবু তাহের, অপর অংশের আবদুল্লাহ আল হারুন, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, বিএনপির শাহাদাৎ হোসেন সেলিম ও রেদোয়ান আহমেদসহ ৪১টি দলের নেতারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। (বাসস)


