
‘ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাতিলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে’
নবীপ্রেমের আবেগে সাদা পোশাকে, মাথায় টুপি আর হাতে নানা রঙের পতাকা-ফেস্টুন নিয়ে রাজশাহীর রাজপথে নেমেছিলেন হাজারো মানুষ। ‘নারায়ে তাকবির’, ‘নারায়ে রিসালাত’, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ’সহ বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নগরীর প্রধান সড়ক। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বুধবার সকালে বিভিন্ন দরবার শরিফ, খানকা, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও অনুসারীদের অংশগ্রহণে বের করা হয় বর্ণাঢ্য জশনে জুলুশ।

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে অনুসারীরা একত্রিত হন। পরে জশনে জুলুশটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে এসে সমবেত হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা ও সমাবেশ। ধর্মীয় সংগীত, হামদ-নাত ও রাসুল (সা.)-এর শানে দরুদ পাঠের মধ্য দিয়ে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
সমাবেশে বক্তারা মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাঁর আগমন মানবজাতির জন্য অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসার বার্তা নিয়ে এসেছিল। শান্তি, মানবিকতা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির আদর্শ ধারণ করে সমাজ ও রাষ্ট্রে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
রাজশাহীর বক্সিয়া দরবার শরিফের প্রধান আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক ও দারুল হাবিব ইয়াদিয়া খানকা শরিফের হাফেজ মাওলানা মো. আব্দুল্লাহ বলেন, “যারা মনে করেন আমরা সংখ্যালঘু, আমরা সংখ্যালঘু নই; আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমরা মারামারি-হানাহানি চাই না, আমরা শান্তি চাই।”

তিনি বলেন, “আমরা এখনো ঘুমিয়ে আছি। যখন তোমরা নবীর বিরুদ্ধে কথা বলবে, সাহাবির বিরুদ্ধে কথা বলবে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিরুদ্ধে কথা বলবে, অলি-আউলিয়া, মসজিদ-মাদ্রাসার বিরুদ্ধে কথা বলবে—তখন সুন্নি জনগণ আর ঘুমিয়ে থাকবে না।”
মহানবী (সা.)-এর আগমনের তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা প্রচলিত ছিল। মহানবী (সা.) এসে নারী ও কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর আগমনে মানুষের মধ্যে মানবিকতা ও ন্যায়বোধের বিকাশ ঘটে।
মিছিলে অংশ নেওয়া আরেক বক্তা বলেন, আল্লাহ শান্তি চেয়েছেন, রাসুল (সা.) শান্তি চেয়েছেন, অলি-আউলিয়াও শান্তি চেয়েছেন—তাই তারাও শান্তির পক্ষেই রয়েছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তি ও সম্প্রীতির পথে চলার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে বক্সিয়া দরবার শরিফের সাজ্জাদানশীন ড. শাহ মোহাম্মদ ওয়াকার আহমাদ মুখতারী বলেন, কোনো একটি বিষয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝার জন্য যেমন বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তেমনি রাসুল (সা.)-এর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও ঈমানের অবস্থাও তাঁর প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
তিনি বলেন, “নবীর প্রেমিক কতটুকু, নবীর প্রতি ভালোবাসা কতটুকু—এটি একটি পরীক্ষার মতো। যে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, আল্লাহর দরবারেও সে উত্তীর্ণ হবে।”
তিনি আরও বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারীদের কাছে মহানবী (সা.)-এর আগমন সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ। তাঁর আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়েই শান্তি ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, মহানবী (সা.)-এর আগমনে অন্ধকার, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবিকতার আলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই নবীর আদর্শকে সামনে রেখে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তারা।
এদিকে জশনে জুলুশে অংশ নেওয়া মানুষের হাতে ছিল বিভিন্ন ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন ও পতাকা। বেশ কয়েকটি ট্রাকে ধর্মীয় বাণী ও নাতে রাসুল পরিবেশন করা হয়। সাদা পোশাক ও টুপি পরা মানুষের দীর্ঘ সারিতে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ছিল মুখর। বিভিন্ন দরবার শরিফের অনুসারীরা নিজ নিজ ব্যানার ও পতাকা নিয়ে মিছিলে অংশ নেন।

সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে সমাবেশে নগরীর বিভিন্ন দরবার ও খানকার অনুসারীরা একত্রিত হন। পরে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। কর্মসূচির একটি অংশ পরে হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.)-এর দরগাহ অভিমুখে যায়।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রাজশাহীতে বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচিও পালিত হয়। অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মিলাদ, দোয়া, হামদ-নাত ও ধর্মীয় আলোচনা ছাড়াও হাসপাতাল, এতিমখানা ও কারাগারে উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কোরআন তিলাওয়াত, সূরা পাঠ, হামদ-নাতসহ ধর্মীয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
এর আগে জশনে জুলুশ ও ধর্মীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি)। ২৩ আগস্ট জারি করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে ঈদে মিলাদুন্নবীর দিন এবং এর আগে-পরে এক দিন করে মোট তিন দিন জারিগান, আতশবাজি, পটকা ও অন্যান্য ক্ষতিকর বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অস্ত্র, তলোয়ার, বর্শা, বন্দুক, ছোরা, লাঠি ও বিস্ফোরক বহন এবং উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
জাতীয় পর্যায়েও বুধবার যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হচ্ছে। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি উপলক্ষে সরকার দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
রাজশাহীতে দিনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মুসল্লিরা মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সবশেষে সম্মিলিত মোনাজাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করা হয়।


