
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়নের নয় বছর পূর্তিতে সোমবার (২৪ আগস্ট) কক্সবাজারে বিক্ষোভ করেছেন শত শত রোহিঙ্গা শরণার্থী। তাদের দাবি একটাই—নিজেদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং পূর্ণ অধিকার নিয়ে ফিরে যেতে চান তারা।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর কেটে গেছে নয় বছর। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশ এখনো কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতেই আটকে আছেন।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ মিয়ানমারের ওই অভিযানকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু এত বছর পরও তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
কারা এই রোহিঙ্গা?
রোহিঙ্গারা মূলত মুসলিম জনগোষ্ঠী, যাদের অধিকাংশের বসবাস মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে।
মিয়ানমারে ১৩৫টি প্রধান জাতিগোষ্ঠী ও সাতটি জাতিগত সংখ্যালঘু রাজ্য থাকলেও রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী তাদের নাগরিকত্বও অস্বীকার করা হয়। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গারা।
মিয়ানমার সরকার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে দাবি করে আসছে। এমনকি ২০১৪ সালের জাতীয় আদমশুমারিতেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
কেন বাংলাদেশে পালিয়ে এলেন লাখ লাখ রোহিঙ্গা?
রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযান নতুন নয়। ১৯৭০-এর দশক থেকেই রাখাইন রাজ্যে তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় ২০১৭ সালের আগস্টে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ব্যাপক অভিযানের মুখে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।
শরণার্থীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার ভয়াবহ ঘটনা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় অন্তত ২০০ রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে ওই অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যার মামলা করে গাম্বিয়া।
বাংলাদেশে এখন কত রোহিঙ্গা?
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছিলেন।
তাদের বেশির ভাগই কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়া শিবিরে বসবাস করছেন। শরণার্থীদের ৭৫ শতাংশের বেশি নারী ও শিশু।
এদিকে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এখনো অনেকে ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আসছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে মিয়ানমার থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। এসব বিপজ্জনক যাত্রায় প্রায় ৯০০ জন মারা যান।
রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবি কী?
কক্সবাজারের বিক্ষোভে রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবি—নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।
তারা চান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুক, যাতে তাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়।
রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী নে সান লুইন বলেন, নয় বছর পার হলেও ন্যায়বিচার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কোনো স্পষ্ট পথ তৈরি হয়নি।
রোহিঙ্গাদের দাবি, তারা নিজেদের ভূমিতে ফিরতে চান অধিকার, নিরাপত্তা, শান্তি, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারসহ।
কমছে আন্তর্জাতিক সহায়তা
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ শুরুতে আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেলেও এখন শরণার্থী সংকট সামলাতে দেশটি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
রোহিঙ্গাদের খাবার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনের বড় অংশই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সহায়তা কমে গেছে।
২০২৬ সালের যৌথ মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় অর্থের আবেদন ২৬ শতাংশ কমিয়ে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার করা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে মূলত সবচেয়ে জরুরি জীবন রক্ষাকারী কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে অর্থসংকটের কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্য ভাউচার ১২.৫০ ডলার থেকে কমিয়ে ৬ ডলার করতে বাধ্য হয়েছিল।
শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও সংকট
অর্থের অভাবে শরণার্থী শিবিরে শিশু ও তরুণদের শিক্ষার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরে শিবিরে আটকে থাকা রোহিঙ্গাদের সামনে তাই প্রশ্ন—তারা কি কখনো নিজ দেশে ফিরতে পারবেন, নাকি শরণার্থী জীবনই তাদের ভবিষ্যৎ হয়ে থাকবে?
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা আবারও সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব যাত্রা প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান
রোহিঙ্গা গণহত্যার নয় বছর পূর্তিতে ঢাকায় যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ১৬টি কূটনৈতিক মিশন যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বক্তব্য ও সহায়তার পাশাপাশি বাস্তবে প্রত্যাবাসনের পথ এখনো তৈরি হয়নি।
গণহত্যার মামলার কী হলো?
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের অভিযান নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ২০১৯ সাল থেকে বিষয়টি তদন্ত করছে। তবে এখন পর্যন্ত এই মামলায় প্রকাশ্যে কোনো অভিযোগপত্র বা বিচার শুরু হয়নি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গাম্বিয়ার করা গণহত্যার মামলাটিও চলছে। ২০২০ সালে আদালত মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে এবং গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
তবে মামলার চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি।
নয় বছর পরও একই প্রশ্ন
২০১৭ সালের সেই ভয়াবহতার নয় বছর পরও কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের জীবন থেমে আছে।
তাদের হাতে নেই মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, নেই নিরাপদে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা। অন্যদিকে বাংলাদেশেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তাই এবারের বিক্ষোভ শুধু একটি স্মরণ দিবসের কর্মসূচি নয়। এটি নয় বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা একটি জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন—আমরা কবে নিজেদের ঘরে ফিরব?


